তবে কি এবার সার্টিফিকেট বিক্রি স্বীকৃতি পাবে?

তবে কি এবার সার্টিফিকেট বিক্রি স্বীকৃতি পাবে? হঠাৎ এই প্রশ্ন শুনে হকচকিয়ে যাবার কিছু নেই শিক্ষা এখন আমাদের দেশে পণ্য হিসাবে দেখা হয়। তার বড় প্রমান এর উপর ভ্যাট আরোপ করা। শিক্ষাখাত সবসময়ই non-profit বা অলাভজনক খাত হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসলেও এখন সেটাকে দেখা হচ্ছে ভিন্ন চোখে। ধরা হয়েছে ১০% কর; যদিও প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছেন কমিয়ে আনতে।

যদ্দুর জানি বাংলাদেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় অনুমতি পায় ১৯৯২ সালে। এর পর এক এক করে এখন মোট ৮৫টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় (ইউজিসির ওয়েব সাইটের লিষ্ট অনুযায়ী) হয়েছে। সংখ্যাটা বাংলাদেশের মত ছোট দেশের জন্য বেশ বড়। তবুও চলছে; আগামীতে হয়ত আরও বেশীই হবে।

প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর কর ধরাটা ঠিক হয়েছে কি হয়নি সেটা নিয়ে কথা বলবার আগে আসেন জানি কেন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় দরকার পড়েছে বাংলাদেশে। দেশের আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা বেশী। আর বর্তমানে শিক্ষার দিকে মানুষের ঝোক বেশী। ফলে প্রতি বছর লাখ লাখ পরীক্ষার্থি পাশ করছে। আর আমাদের সরকার গুলি বরাবরই পাবলিক বিশ্বদ্যালয়ে তাদের জায়গা করে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এতে করে প্রচুর পরিমানে ছাত্র-ছাত্রী উচ্চশিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিলো। আর তারই প্রেক্ষিতে এই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আবতরণা।

একটা ছাত্র-ছাত্রীর ভালো রেজাল্টের হিসাব ৪.৫-৫ গ্রেড পয়েন্ট ধরা হলেও যে কয়জন ছাত্র-ছাত্রী এই রেজাল্ট করে, তাদের জায়গা দিতে পারে না সরকারী বিশ্ববিদ্যায় গুলি। যার ফলশ্রুতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও গত কয়েক বছর থেকে ২য়বার পরীক্ষা দেওয়া যাবে না এমন একটা কথা শোনা যাচ্ছে বার বারই। আর যারা ৪.৫ এর নিচে আছে, তাদের কথা এখনও ধরিই নাই। এই যে উপচে পড়া শিক্ষার্থী, তারা কোথায় যাবে? লেখা পড়া বন্ধ করে দিবে? নাকি উচ্ছন্নে যাবে? নাকি বিদেশে যাবে? কয়জনারইবা সামর্থ হয় বিদেশে যাবার। যারা পারে, চলে যায়, আর বাকিরা থেকে যায় দেশে। বেশ বড় একটা সংখ্যায় ভর্তি হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধীনস্ত কলেজে গুলিতে। আর বাকিরা যায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে।

খুব অবাক করা বিষয় হচ্ছে এই সমস্যার কথা আমরা প্রায় সবাই জানিই না। আমাদের কিছুটা ধারণা এমন যে প্রাইভেটে যারা পড়তে যায়, তারা আসলে প্রচন্ড বড়োলোকের ছেলে-মেয়ে, এরা শখ করে যায়। কিন্তু আপনি আমি হয়ত খবরও রাখি না যে এরা কত গরীব পরিবার থেকে আসে। শোনা কথা বাদ দেই; আমি নিজে যা দেখেছি তাই বলি। আমি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন ছাত্র-ছাত্রী দেখেছি যারা টিউশন ফি কিংবা থাকা-খাওয়া খরচ যোগাড় করতে রেস্টুরেন্ট, শপিং সেন্টার, দোকান এমনকি লেগুনা পর্যন্ত চালিয়েছে।

কয়েকদিন আগে মুনির হাসার স্যার প্রথম আলো পত্রিকায় “উপেক্ষিত যুব সম্প্রদায়” লেখায় সুন্দর একটি কথা বলেছেন, সরাসরি কোট করছিঃ

একসময় ধরা হতো কেবল ধনীর দুলালই সেখানকার শিক্ষার্থী। এখন কিন্তু তা নয়। বরং ছবিটা উল্টো। প্রধানত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা এত তীব্র যে গরিব, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে সেখানে সুযোগ পাওয়া এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। যারা এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে, তাদের অনেককেই বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করে ভর্তি পরীক্ষার কোচিংয়ে ভর্তি হতে হয় এবং কোচিং না করলে ভর্তি হওয়া কঠিন। এমনকি এইচএসসি পরীক্ষার অন্তত চার-ছয় মাস আগে থেকে কোচিং সেন্টারে আগাম টাকা দিয়ে ভর্তি হতে হয়! যারা কোচিংয়ের সুবিধা পাচ্ছে না এবং যারা প্রান্তিক অঞ্চল থেকে আসছে, তাদের পক্ষে তাই কম টাকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধরাই থেকে যাচ্ছে। বাবা-ভাইয়ের কষ্টের টাকা দিয়ে তাকে এসে ভর্তি হতে হচ্ছে বেশি খরচের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হচ্ছে বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন-সুবিধা নেই। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো শায়েস্তা খাঁর আমলের খরচে সে থাকার সুবিধাও পাচ্ছে না।

স্যারের কথাটা যে কতটুকু সত্য তা আপনি নিজে একজন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী কিংবা তার অবিভাবক না হলে বুঝবেনই না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে খরচে খাওয়া যায়, তার কয়েকগুন টাকা দিয়ে বাইরে খেতে হয়। যে খরচে থাকা যায়, তারও কয়েকগুন খরচে বাইরে থাকতে হয়। ফলে খরচ এখানে বেশীই। আর যারা এখনও মনে করেন যে এখানে শুধু ধনীর ছেলে-মেয়েরাই পড়ে, তাদের বলছি, মাথায় বেশি করে পানি ঢালেন, মাথা ঠান্ডা হবে।

এবার ফিরে আসি আমার লেখার টাইটেলের কথাটা নিয়ে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বাইরে থেকে একটা অপপ্রচার চালনো হয় যে এখানে নাকি টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট বিক্রি হয়। যদিও এই পর্যন্ত ১জনকেও পাই নাই যে এই টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট এনে দিতে পারবে। আপনার যদি মনে হয় যে আপনি পারবেন, তাহলে প্লিজ প্লিজ প্লিজ মন্তব্যের ঘরে আপনার কন্টাক্ট ডিটেইলস লিখে যাবেন; আমি কিনবো! আমি জানি আপনি পারবেন না; কিন্তু তারপরও আপনি বলে বেড়াবেন যে সার্টিফিকেট বিক্রি হয়।

এখন হিসাব করেন, সেবাখাত থাকা অবস্থাতেই ধরা হয় এরা ব্যবসা করছে, আর এখন যদি তাতে সামান্যও কর ধরা হয়, তার মানে দাড়াবে যে এটা যে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তার একটা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে দেওয়। আর ব্যবসায় তো অনেক কিছুই হয়। ফলে সার্টিফিকেট বিক্রি এতদিন না হলেও এখন করতে আর কোন বাঁধা আছে বলে আমি মনে করি না। এখন যদি বিশ্ববিদ্যালয় গুলিও এটা শুরু করে, তখন তা নিয়ে কথা বলবার অধীকারও কিন্তু আমাদের কমে যাবে। আবার কিছুদিন আগেই আমাদের মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন যে বিদেশে স্পিড মানি আছে, আর এটাকে ঘুষ বলে না। তো, যেহেতু শিক্ষা এখন ব্যবসাই, তাহলে আমরা কেন স্পিড মানি দিয়ে একটু দ্রুত সার্টিফিকেটটা পাবো না?

দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন ১টাকা বাড়াতে গেলেও তারা আন্দোলন করে ভাঙ্গচুর করে, আর প্রাইভেটের খরচ ১০% বাড়ায় দেওয়া হলেও সেটা নিয়ে কথা বলাটা অপরাধ! দেশের অন্যতম বড় ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগও এই কর এর পক্ষে। তবে মজার বিষয় হচ্ছে তারা নাকি আশঙ্কা করেছেন যে এটা ছাত্র-ছাত্রীদের উপরে চাপানো হতে পারে। সত্যিই, কথাটা পড়ে আমি কয়েক মিনিট খ্যাক খ্যাক করে হাসছি খালি। উনারা খুব সম্ভবত জীবনে কখনও কোথাও করে দেন নাই; বা কিছু কিনেন নাই। কারণ উনারা কিনলে জানতেন যে করটা গ্রাহককেই দিতে হয়। এটা বিক্রেতা পরিশোধ করে না।

যাই হোক, ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলন আর প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধের পর আর এই কর একেবারে না থাকার বিষয়ে কোনই সম্ভাবনা দেখছি না; আর কারও রোষানলে পড়তে চাই না। তবে এটা ভাবতেই কষ্ট লাগে যে আমার দেশে এখন শিক্ষা আর শিক্ষা নাই; পণ্য হয়ে গেছে।

Shafiul - শফিউল

I'm Shafiul Alam Chowdhury, I like to call myself a blogger, but I don't really blog that much. My favourite pass time is watching movies and reading books. I like to inspire people, even though me myself is not much become inspired by other people :P . I own a business, currently it focuses developing websites for companies and people. The site is SiteNameBD.com. Beside these have great plans for me and my country.

Leave a Reply