একজন নতুন ছোট উদ্দ্যোক্তা কেন বেশী চিল্লা পাল্লা করে

একজন নতুন ছোট উদ্দ্যোক্তা কেন বেশী চিল্লা পাল্লা করে এটা নিয়ে অনেকেরই বিশাল চিন্তা। তারা পলিটিকাল লিডারদের মিথ্যা কথা গুলি হাসতে হাসতে মাথা দুলাতে দুলাতে মেনে নিলেও একজন ছোট উদ্দ্যোক্তা হাজার সত্য কথা বলতে গেলেই তার ভূল ধরে; মেনে নিতে পারে না। আমি একজন চরম ক্ষুদ্র উদ্দ্যোক্ত; আমার মাপের থেকে আমি বেশী চিল্লাই, চাকরীরে এক প্রকার ঘৃণা করি বলেই প্রকাশ করি। কিন্তু আসলে কি তাই? আসলেই কি আমি চাকরীকে ঘৃণা করি? আমি কেন এত ফাউ চিল্লাই? আমার নিজের দৃষ্টিকোন থেকে তার কিছু ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করি।

উপরের প্যারা টুকু ভূলে যান, আমি দুইটা গল্প বলি। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের গল্প; শ্রীমঙ্গলের কোন এক চা বাগানের জঙ্গলে ছোট্ট একটা তাবু ফেলে আকাশের দিকে তাকায় আছি। রাত্র ২/৩টা হবে। রাস্তায় কোন লাইট নেই, দৃষ্টিসীমার মধ্যে দূরে একটা ১০০ওয়াটের বাল্ব জ্বলতে দেখা যায়। শীতের কুয়াশার মধ্যেও আকাশের তারা স্পষ্ট। জঙ্গলের থেকে একটু দূরেই রাস্তা, আগেই বলেছি সেখানে লাইট নেই। কিছু সময় পর পর এক/দু জন করে পথচারী যাচ্ছেন, খেটে খাওয়া মানুষ। যারা দুজন যাচ্ছেন, তারা বেশ উচ্চস্বরে কথা বলছেন, আর একজন গেলে চিৎকার করে গান গাইতে গাইতে যাচ্ছেন, সে যতই বাজে সুরের গলা হোক না কেন।

দ্বিতীয় গল্প আপনাকে নিয়ে, যিনি এই লেখা পড়ছেন। আপনি ভূতের ভয় পান বা না পান, রাত্রে কখনও একলা বাসায় থাকলে আপনি দেখবেন নিজে থেকেই একটু বেশী শব্দ করেন, একটু জোরে গান গান, বিনা কারণে গলাখাকারী দেন, জোরে দরজা বন্ধ করেন।

এখন যদি আপনাকে প্রশ্ন করি, উনারা কেন গান গাচ্ছিলেন আর আপনি কেনই বা জোরে শব্দ করছিলেন; আপনি অনায়েসে উত্তর দিবেন, ভয় তাড়াবার জন্য। কিসের ভয়? ভূতের? আপনি জানেন যে ভূত বলতে কিছুই নেই। তারপরও ভূত তাড়াবার জন্য এই ব্যবস্থা। আচ্ছ ধরি ভূত আছে, আপনি ভূতকে ভয় পাচ্ছেন, ভূত কেন আপনার শব্দে ভয় পাবে? কেন শব্দে দূরে থাকবে? এই প্রশ্নের উত্তর নেই।

বিষয় হচ্ছে মানুষ যখন একা থাকে, যখন তার ভয় হয়, তখন সে একটু শব্দ করে নিজের একাকিত্বটা দূর করতে চায়, চায় নিজেই নিজেকে একটু শক্ত রাখতে। তাকে এই প্রসেস শিখিয়ে দিতে হয় না। তাকে কেউ কখনও বলে দেয় না ভয় পেলে কি করতে হবে। সে নিজে থেকেই করে।

নতুন উদ্দ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে বিষয়টা একই রকম হয়ে দাড়ায়। ভূত না থাকলেও মানুষের ভয় দূর করতে হয়, আর তাদের তো অনেক কিছুই ভয়ের আছেঃ মানুষের কটু কথা, পরিবার থেকে চাকরী করবার জন্য চাপ, বয়ফ্রেন্ড/গার্লফ্রেন্ডের চলে যাওয়ার হুমকি, উদ্দ্যোগে বিনিয়োগের অভাব, উদ্দ্যোগে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা, উদ্দ্যোগ লসের মুখ দেখার সম্ভাবনা, আরও কত কি। এই ভয়গুলি এতই বড় ভয় যে ভূত যদি সত্যি থাকতোও, তাহলেও কোন দিন কোন নতুন উদ্দ্যোক্তার ধারে কাছে ভিড়তো না, কারণ তারা ভূতকে ভয় পাবার সময় পেতো না, ভয় দেবার চেষ্টা করে ভূতেরও সময় নষ্ট হতো।

হ্যাঁ, উপরের কারণেই একজন নতুন উদ্দ্যোক্তাকে একটু জোরে শব্দ করতে হয়। সে যতই খারাপ অবস্থায় থাকুক না কেন, জোরে তাকে বলতে হয় all is well! একটা বা* না ছিড়তে পেরেও ভাব দেখাতে হয় কারও মাথার চুল সব তুলে ফেলেছে। একটা কাষ্টমার পেলে এমন ভাব করতে হয় যেন দুনিয়ার সবাই তার কাষ্টমার হয়ে গিয়েছে। এতটুকু সাফল্যের দেখা পেলে ভান করতে হয় যেন সে বিলগেটস এর মত সাফল্য পেয়ে গেছে। একজন চাকরী করতে চায় শুনলে ভাব করতে হয় চাকরীর থেকে খারাপ কিছু আর নাই।

কিন্তু না, নতুন উদ্দ্যোক্তারা কখনওই চাকরীজীবিদের ঘৃণা করে না, অপছন্দ করে না, এমনকি সামান্যতম বিদ্বেষও তাদের প্রতি নেই। বরং নতুন উদ্দ্যোক্তারা যখন স্বপ্ন দেখে বড় কিছু করবার, তারা স্বপ্ন দেখে বড় একটা অফিসে হাজারো এম্প্লয়ি চাকরী করেছে, এই এম্প্লয়িরাতো সবাই চাকুরীজীবি, তাদের কেন ঐ উদ্দ্যোক্তা অপছন্দ করবে? আসলে অপছন্দ করে বলে একটা ভাব দেখাতে বাধ্য হয়, কারণ তার নিজের সেল্ফ কনফিডেন্স বাড়াতে হবে। পুরো সমাজ যখন জিকির তুলে দেয় যে চাকরীই ভালো, তার নিজের ‘চাকরী ঘৃণা করি’ কথাটা দিয়ে নিজেকে উজ্জিবিত রাখতে হয়; নিজেকে বুঝাতে হয় যে সে আসলেই ভালো আছে, সে আসলেই ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তার নিজেকে তার নিজের পৃথীবির পরিচিত সব কিছুর সাথে যুদ্ধ করতে হয়।

আপনি যখন চিন্তা করেন যে একজন ছোট উদ্দ্যোক্তা এত চিল্লায় কেন, তখন এটা জেনে রাখবেন যে তার চিল্লানোর পিছনে আপনি দায়ী, সমাজ দায়ী। আপনারা যদি একটু কষ্ট করে মুখটা বন্ধ রাখতেন, তাহলে এই ছোট উদ্দ্যোক্তারা তাদের কাজে মন দিতে পারতো, তাদেরও চিল্লাইতে ভালো লাগে না। আপনাদের সাথে যুদ্ধ করার কোন ইচ্ছাও তাদের নাই। আপনারা পায়ে পাড়া দেন দেখেই তাদের কথা বলতে হয়, ঝগড়া করতে হয়।

শেষ আর একটা কথা, আজকের যত বড় বড় কম্পানি আছে, কোন না কোন দিন তারা ছিলো ছোট একটা উদ্দ্যোগ, একসময় তাদেরও মানুষ কটাক্ষ্য করেছে, কিন্তু আজকে মানুষ সেই সব কম্পানিতেই চাকরী খুঁজে। তাই মুখটা বন্ধ রাখুন, কারণ হতে পারে আজকে যেই ছোট উদ্দ্যোক্তাকে আপনি কটাক্ষ্য করছেন, সেই ছোট উদ্দ্যোক্তার কোন একটা ফার্মে আপনারই সন্তান বা তাদের সন্তান চাকরীর ইন্টারভিউতে ডাকের জন্যই মুখিয়ে থাকতে পারে, চাকরী পেলে নিজের জীবনকে ধন্য মনে করতে পারে।

So, brothers & sisters out there who are trying their best to fight the battle and do something good, shout out loud, scare the shi* out of them, let them know we are what we are. Haters gonna hate.

আরও পড়তে পারেনঃ

ব্যবসা নয়, চাকরীই বেশি ঝুকিপূর্ণ

আসেন, গোবোরে লাথি দিয়া প্রমান করি আমি পারি!

 

9 thoughts on “একজন নতুন ছোট উদ্দ্যোক্তা কেন বেশী চিল্লা পাল্লা করে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *