নামকরণের কোন স্বার্থকতা নাই!

নামকরণের কোন স্বার্থকতা নাই! এই কথাটা যদি স্কুল কলেজে থাকতে স্যারদের বুঝাইতে পারতাম, তাহলে কাজের কাজ হইতো। যদিও তখনও এতটা পরিস্কার ধারণা ছিলো না। আবার এখনও যে বুঝাইতে পারবো তারও কোন গ্যারান্টি নাই। যদিও আমার বিশ্বাস যে এই বিষয়ে আমার নিজের ধারণা এখন খুবই পরিস্কার। তবে যদি আপনাদের কাউকেই বুঝাইতে না পারি তাহলে গুরুজনেদের কথায় ধরে নিতে হবে যে আমার নিজেরই ধারণা পরিস্কার না। কেননা গুরুজনেরা বলেছেন, তুমি যদি তোমার কথা সোজা কথায় অন্যকে বুঝাইতে না পারো, তাহলে তোমার নিজের কথার সম্পর্কেই নিজের ধারণা নাই। যাই হোক, চেষ্টা করতে তো দোষ নাই।

নামকরণের কোন স্বার্থকতা নাই! এই থিউরীতে কেন আসলাম হঠাৎ সেইটার একটা প্রেক্ষাপট বলি। বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় সমস্যা হচ্ছে বেকারত্ব সমস্যা। আর এই সমস্যার সমাধান হচ্ছে উদ্যোক্তা তৈরী করা। কিন্তু প্রত্যেক উদ্যোক্তার একটা বড় সমস্যা হচ্ছে তার প্রতিষ্ঠানের নাম কি হবে সেইটা ঠিক করা! আর যেহেতু আমি এখানে ওখানে বকবক করে বেড়াই, তাই মাঝে মধ্যেই মানুষ আমাকে ভূলে জ্ঞানী মনে করে আমার কাছে নাম সাজেশন চায়! আর আমি কোন উত্তর দিতে পারি না, এবং সেটা তাদের কাছে হয়ে দাড়ায় “ভাব নিচ্ছে” টাইপের কিছু! অতঃপর অনেক চিন্তা ভাবনা করে দেখলাম আসলে নামকরণের কোন স্বার্থকতা নাই। স্কুল কলেজে যেইসব গল্প-কবিতা-উপন্যাস-নাটকের নাম করণের স্বার্থকতা পড়ানো হয়েছে, ঐগুলানও ভুয়া! তাহলে দাড়ালো আজকের এই লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের সব থেকে বড় সমস্যার সব থেকে বড় সমাধানের সব থেকে বড় সমস্যার সব থেকে বড় সমাধান বের করা! আসুন ট্রাই করি।

নামকরণ একটা কঠিন বিষয়। কিন্তু নাম করণ করতে গিয়ে আমরা বিষয়টাকে যেভাবে গুলিয়ে পাকিয়ে ফেলি তা মোটেও কাঙ্খিত নয়। আমরা কাজে নয়, নামেই বড় হবার প্রতিযোগীতায় নেমে পড়ি। ফলাফল এনার্জি নষ্ট! বিশ্বের বড় বড় কম্পানি গুলির দিকে তাকালেই বুঝবেন যে তাদের কাছে নামকরণটা বড় কিছু ছিলো না। আমার বিশ্বাস গুগল, ফেসবুক, এপেল, মাইক্রোসফট ইত্যাদি ইত্যাদি কম্পানী তাদের নামকরণ নিয়ে যেই পরিমানে পরিশ্রম দিয়েছে, তার থেকে আমাদের দেশের তরুন উদ্যোক্তারা বেশী সময় দিয়ে ফেলেন। আসুন একে একে কিছু কম্পানির নামকরণের স্বার্থকতা খোঁজার চেষ্টা করি।

Google.com

যদিও এটির সম্পর্কে সবার কথা হচ্ছে এটি মূলত googol (যার অর্থ ১ এর পর ১০০টি শূন্য) হবার কথা ছিলো, কিন্তু প্রথম যেই চেক তারা পান, সেই চেক দাতা ভুলে Google নাম দিয়ে দেওয়ায় তারা সেটাই ব্যবহার করে যাচ্ছেন। দেখুন, ভুল বানানে তাদের কিছু আসে যায় নাই, তাদের কাজটা দরকার ছিলো। আমাদের দেশের তরুন CEO রা হলে কি করতেন? ঐ লোককে দিয়ে নতুন একটা চেক লেখাতেন নিশ্চিত!

Oracle

যারা একটু কম্পিউটার, প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ, ডাটাবেজ ইত্যাদির নাম জানেন, তারা সবাই ওরাকল এর নাম শুনেছেন। এর অর্থৎ জানেন? শব্দটার কয়েকটা অর্থৎ হচ্ছে, দৈববাণী, আকাশবাণী, দৈববাণীর স্থান, দৈববাণীর দেবতা, সুবিজ্ঞ ব্যক্তি! চিন্তা করতে পারেন একটা ডাটাবেজ এর নাম “সুবিজ্ঞ ব্যক্তি ডাটাবেজ”! নাহ, তারপরও আপনি নাম নিয়ে চিন্তিত‍!

Lynda.com

লিন্ডা.কম এর নাম শুনেনাই এমন লোক (যারা কম্পিউটারের বিভিন্ন জিনিষ আসলেই শিখতে চায় এমন লোক) অনলাইন জগতে পাওয়া দুস্কর। কিন্তু নামটা কখনও লক্ষ্য করেছেন কি? লিন্ডা নামের একজন তার নিজের ওয়েব সাইটে টিউটোরিয়াল আপলোড করতে করতে এখন সেইটা একটা বিশাল বিজনেস! আর আমরা কি করতেছি? নিজের নামে কিছু করতে লজ্জা লাগে! পাছে লোকে কিছু বলে।

আলিবাবা.কম

ছোট থাকতে শুনেছি আলিবাবা আর চল্লিশ চোরের গল্প, আর বড় হয়ে দেখি আলিবাবা.কম। আলিবাবা.কম এর মালিক জ্যাক মা এর কোন কথা শুনলে, পড়লে আমরা নিজেদের ধন্য মনে করি। কিন্তু চিন্তা করেন, দেশীয় কোন কম্পানি যখন তাদের তৈরী দরজার নাম রাখে “আলিবাবা ডোর” এবং সেটা বানিজ্য মেলায় প্রচার করে, তখন আমরা হাসি আর বলি, নাম আর পায় নাই?

Godaddy.com

কোন হিসাবে গো ড্যাডি (বাপ তুমি যাও) নামটা ডোমেইন-হোস্টিং এর সাথে মানায়? তারপরও তারা এই আজগুইবি নাম নিয়েই দুনিয়া কাপায় ডোমেইন-হোস্টিং বিক্রি করতেছে। নাকি করতেছে না?

মুস্তফা মার্টঃ

ইন্টারন্যাশনাল সুপাস্টোর চেইন শপ। নামকরণ কি করা হয়েছে, মুস্তফা নামে! এর থেকে কি আগোরা বা স্বপ্ন নামটা বেশী ক্রিয়েটিভ নয়? কিন্তু তার পরও, মুস্তফা মার্ট ইজ মুস্তফা মার্ট!

আরও উদাহরণ লাগবে? Honda – একজনের নাম, Ford – একজনের নাম, Fobrs – একজনের নাম, Gucci – একজনের নাম এবং এগুলি দুনিয়া কাপানো কম্পানির নামও বটে! আরও এমন লিষ্ট দেখতে চান? একটা-দুইটা-চাইরটা-দশটা না, শত শত আছে। এখানে ক্লিক করেন তাহলেই দেখতে পাবেন।

আসেন, সাথে সাথে দেখি দেশীয় কিছু নামকরণের ভূল ব্যাখ্যা, যা আমরা এসএসসি, এইচএসসিতে পড়ে আসছি, এবং এতদিন বিশ্বাস করতাম যে সেগুলিই ঠিক ছিলো।

রক্তাক্ত প্রান্তরঃ

আমার পড়া বাংলা নাটক গুলির মধ্যে অন্যতম সেরা নাটক এটি। কিন্তু আমার ধারণা এই নাটকের নামকরণের কোন স্বার্থকতাই ছিলো না। যদ্দুর মনে পড়ে এই নাটকে ইব্রাহীম কার্দি নামের একজন তার নিজের আদর্শে অবিচল থাকতে গিয়ে পরিবারের থেকে আলাদা হয়, মৃত্যু বরণ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার আদর্শে অবিচল থাকে। তার কথা ছিলো, তার বিপদের সময়, নতুন ভেবে কেউ তাকে জায়গা দেয় নাই। যারা তাকে জায়গা দিয়েছে সে তাদের হয়েই থাকবে। এইটা যে কত বড় একটা শিক্ষা ছিলো, তা বলবার মত না। কিন্তু “রক্তাক্ত প্রান্তর” নাম করণের ফলে মূল জায়গাটাতেই আমরা ফোকাস থাকতে পারি না। একটা ছেলে চাকরী পাচ্ছে না, তাকে একজন দয়া করে চাকরী দিলো, ৬/১২ মাস পর এক্সপেরিয়েন্স গুছিয়ে সে “বেটার অপারচুনুয়েটির” জন্য অন্য কম্পানিতে ঝাপ দিলো। কিন্তু এই নাটকের নাম যদি রক্তাক্ত প্রান্তর না হয়ে এমন কিছু হতো যে “কৃতজ্ঞতার উদাহরণ” বা এমন কিছু, তাহলে হয়ত আমাদের মাথায় থাকতো বিষয়টা।

পদ্মা নদীর মাঝিঃ

দুর্দান্ত একটা উপন্যাস। নামকরণেও আমরা ম্যালা স্বার্থকতা খুজে পাই। কিন্তু আবার এইটারে পর্যালোচনা করতে গিয়ে আমরা দেখাই যে গরীব শ্রেণী কিভাবে নির্যাতিত, নিশ্পেশিত, অসাহায় ইত্যাদি ইত্যাদি হয়ে ধরা খাইতেছে! এই দুর্দান্ত উপন্যাসের নাম যদি পদ্মা নদীর মাঝি না হয়ে “গরীবের ভাগ্য” টাইপের কিছু হইতো, তাইলেও মাইনা নেওয়া যাইত! এমন না যে এমন ঘটনা শুধু পদ্মা নদীর মাঝির উপরেই ঘটে। আর একটা কথা, এই উপন্যাসের নাম যদি আগড়ুমবাগড়ুমও হইতো, এইটা হিট করতোই করতো। কারণ কাহিনীই দুর্দান্ত!

হাজার বছর ধরেঃ

এইটা নিয়া বেশী কিছু বলবো না। এইটাও বেশ ভালোই একটা উপন্যাস। তবে এমন না যে হাজার বছর ধরে এইসবই ঘইটা আসতেছে। আর ঘইটা আসলে “বুড়া বয়সের ভীমরতি” কিংবা “মন্তু মিয়ার খাসলত” নাম দিলেও খারাপ চলতো না উপন্যাসটা!

আমার কথাঃ

উদাহরণ দিতে গিয়ে অনেক বাজে বাজে কথা বলে ফেলছি। অনেকেই এগুলি মানতে চাইবেন না হয়ত। কিন্তু বিশ্বাস করেন, নামকরণের পিছে সময় না দিয়ে কাজের পিছনে সময় দেন। তাহলেই কাজে দিবে। নাম চাইলে আপনি যে কোন সময় পরিবর্তন করতে পারবেন। কিন্তু কাজ যদি আজকে না করন, তাহলে আর কবে করবেন?

আমি বলছি না যে ভালো নামের দরকার নাই। অবশ্যই দরকার আছে। তবে সেটা এতবড় নয় যে নামের জন্য কাজই করতে পারবন না।

সবাই ভালো থাকবেন।

One thought on “নামকরণের কোন স্বার্থকতা নাই!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *