আমার দেখা সত্যিকারের ভূত

আমার দেখা সত্যিকারের ভূত নিয়ে কথা বলবো আজকে। সত্যিকারের ভূত বলতে সত্যিই ভূত, কোন ভূল নাই, এবং এটা প্রমানিত! আসেন তাহলে শুরু করি।

সময়কাল ২০০৫-২০০৬ হবে। তখন থাকি খুলনাতে, আমাদের নিজেদের বাড়ি। মফস্বল এলাকায় যারা বড় হয়েছেন তারা নিশ্চিত জানেন যে হাটা দূরত্বের ৫মিনিটের রাস্তার মধ্যে এলাকার প্রায় সবাই পরিচিত থাকে। যারা বড় হয়েছেন ঢাকাতে, তাদের এমন হয় যে পাশের ফ্লাটে কে তাকে তাই হয়ত জানা হয় না। যাই হোক, মফস্বলের কথা বলছি, খুলনার কথা। খুলনার দৌলতপুর থানার অধীনে ৫নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আমি।

হঠাৎ একদিন আমাদের কাজের মহিলা (আলেয়া আপা) এসে জানালো যে যুথি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। পৃথিবীতে আমি সবার প্রতি সমবেদনা দেখাতে পারলেও এই আত্মহত্যা পার্টিদের একদমই সহ্য করতে পারি না। মারা গেলে লাশ দেখতে যাই না, খবর নেই না, জানাযায় যাই না আর কবরে যাওয়াতো অনেক দূরের বিষয়।

তো আমি আর গায়ে মাখালাম না। বরং মেজাজ খারাপ হতে লাগল। আমার স্মৃতি যুথির সব কিছু ডিলিট করবার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তার পরের দিন ছিল শুক্রবার; আমি দৌলতপুর বাজারে গেছি কিছু একটা কিনতে। কিনে ফেরার পথে মিনাক্ষী হলের সামনে একটা দোকানে টিকিয়া বিক্রি করতো, ঐটা কিনে খেতে খেতে আলি বক্সের বাড়ির মধ্যে দিয়ে আসতে থাকি। আমি আমার জীবনের প্রথম ২২ বছরের পুরোটাই কাটিয়েছি খুলনা, কিন্তু এই পথ বেশি হলে ১০/১২বার পাড়ি দিয়েছি। সাধারণত আমি এই বাড়ির মধ্যে দিয়ে যাই না।

যাই হোক, বাড়ি হতে বের হবার গলির মাথায় একটা কবর স্থান। আমি যখন গলির মাঝা মাঝি, তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে, মাগরীবের আজান হচ্ছে মাত্র। আকাশ মেঘলা থাকায় বেশ অন্ধকার। এই অন্ধকারের মধ্যে সামনেই দেখলাম যুথি দাড়িয়ে। আমাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলো, “ভাইয়া কেমন আছেন?”

মনে হল বুকের উপরে কেউ একটা মুগুর দিয়ে বাড়ি দিল। লক্ষ্য করলাম যে আমার হাতে থাকা টিকিয়া তখন হাতের সাথে যেন আঠা হয়ে লেগে গেছে, আর মুখের ভেতর থাকা টিকিয়া বহুত চেষ্টা করেও নামাতে পারছিলাম না। পানির পিপাসা কত সিরিয়াস হতে পারে জীবনে প্রথমবারের মত অনুভব করলাম। ঘুমের মধ্যে দৌড়াতে গেলে গা হাতপা যেমন খুব ভারী মনে হয়, ঠিক সেইরকম হয়ে গেল। অনেক কষ্টে ঢোক গিলে উত্তর করলাম, “ভাল আছি, তোমার খবর কি?”

উত্তরে যুথি কিছু না হলে ফিক করে হেসে দিল। আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করল, “আযান দিছে, নামাজে যাবেন না?”

আমি উত্তর করলাম, “হ্যাঁ যাব, দেরী হয়ে যাচ্ছে। গেলাম তাহলে।”

এটা বলে আমি দৌড় দিলাম। পিছোনে ফিরে তাকাবার সাহস বা শক্তি কোনটাই ছিলো না। দৌড়াতে দৌড়াতে মসজিদে উঠলাম। নামাজ পড়ে আরও কয়েকজনের সাথে সাথে বাড়ি ফিরলাম। বাড়ি ফিরে তখনও গা হাত-পা কাপছেঁ; ভয় পাচ্ছিলাম জ্বর বা অন্য কিছু না চলে আসে।

এর মধ্যে আলেয়া আপা জিজ্ঞাসা বলল, ও ভাইয়া, তোমার বন্ধুর বোন আত্মহত্যা করলো, আর তুমি একটা বার দেখতেও গেলা না? রুবেল তোমার কথা বলতেছিলো।

কিছু সময়ের জন্য সব আউলানো লাগলো, জুথির কোন ভাই নেই। আর রুবেল আমার বন্ধু, কিন্তু ওর বোনের নাম তো রুথী! আমি আলেয়া আপাকে জিজ্ঞাসা করলাম যে গলায় দড়ি দিছে কে? যুথি না রুথি? উনি উত্তর করলেন, আমিতো দুইজনের নামই যুথি বলি।

যুথিকে কবরস্থানের পাশে দেখার পর প্রায় ৩০ মিনিট চলে গেছে, এতো সময় পর এই প্রথম মনে হল নিঃস্বাশ নিলাম। বুঝতে পারলাম যে আমি ভূত না, মানুষই দেখেছি। কারণ মারা গেছে রুথি, আর আমি দেখেছি যুথিকে।

এখনও মনে পড়লে আমার কেমন যেন লাগে, ঐদিন মনে হয়েছিলো যে মনে হয় এই আমার জীবনের শেষ, এই বুঝি গেলাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *