“Ctrl + C > Ctrl + V” বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

Ctrl + C > Ctrl + V লেখাটা দেখে কম্পিউটার সম্পর্কে এতটুকু জানেন এমন মানুষও বুঝে যাবেন যে আমি কপি পেষ্টের কথা বলছি। তবে এর মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন কথা আসছে তা হয়ত অনেকেরই এখনও বুঝে আসে নাই। আমি মূলত আমাদের দেশের সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলছি।

আমরা যে জাতিগত ভাবে কপি পেষ্টের কালচারে ঢুকে গেছি, তার সব থেকে বড় এবং চোখে আঙ্গুল দিয়ে প্রমানটা আমরা গত বছরই পেয়েছি যখন রোজার ঈদে “পাখি” ড্রেস নিয়ে কামড়া-কামড়ি, মারামারি, ধুন্ধুমার, আত্মহত্যার মত ঘটনা ঘটেছে তখনই। ভারতীয় সিরিয়াল নিয়ে অনেক আগে থেকেই কথা চলে আসছে, কিন্তু সেটার একটা ড্রেস যে একটা জাতিকে কিভাবে নাড়া দিতে পারে তার উদাহরণ দেখিয়েছে এই “পাখি”।

গতবছরের কথা মনে পড়লেই এখনও গা শিউরে উঠে, তালাক, আত্মহত্যা, ঝগড়া, মারামারি সবই হয়েছে এই “পাখি” ড্রেস নিয়ে। এখানে আমরা কি করেছি, সোজাসুজি ভারতের একটা ডিজাইন এবং ট্রেন্ড আমরা কপি পেষ্ট করে ছেড়ে দিয়েছি। গত বছর এক পর্ণ স্টারের ড্রেস নিয়েও কথা বলতে শুনেছি অনেককে; কিন্তু একজন পর্ণস্টারের ড্রেস কেমন হতে পারে তা বুঝে উঠতে পারি নাই।

আমার অফিস মিরপুর ১১তে, রিক্সা বা বাসে বসে অনায়াসেই বিভিন্ন বিজ্ঞাপন দেখে পাওয়া যায়; এবং আমার যেহেতু বিজ্ঞাপনের দিকে প্রচন্ড আগ্রহ আছে, তাই আমি এগুলি দেখি। গত কয়েক দিনে এপেক্সের বিজ্ঞাপনটা আমাকে বেশ ভালোই ভাবিয়েছে। এপেক্সের বিজ্ঞাপনে কতগুলা জুতার ছবি দিয়ে বলা হয়েছে, Trending in London, Trending in Paris, Trending in New York, Trending in Tokyo ইত্যাদি।

প্রশ্ন জাগে মনে, বিদেশে কি ট্রেন্ডিং সেটা আমাকে দেখতে, জানতে এবং পরতে হবে; আমার দেশে কি ট্রেন্ডিং তা নিয়ে কেউই ভাববে না। আমার দেশে কি ডিজাইনার নাই? আমার দেশে কি ফলো করবার মত কেউ নাই? আমার দেশে কি ভালো কিছু নাই? জানি আপনি এই প্রশ্ন কয়টার উত্তর মনে মনে দিয়ে ফেলেছেন; এবং বলেছেন যে নাহ, নাই!

কিন্তু উত্তরটা দেবার আগে একবার ভেবেছেন কি, বাংলাদেশের ডিজাইন করা এবং তৈরী করা ড্রেসই কিন্তু যাচ্ছে সারা বিশ্বে। বাংলাদেশের থেকে জুতাও কম রপ্তানী হয় না। কিন্তু তারপরও কেন আমরা আমাদেরটা নিয়ে থাকতে পারছি না? কেন বারবার আমাদের ফলো করা লাগছে অন্যে যা ফলো করছে?

ছোট বেলায় দেখতাম কিছু একটা হলেই শোক জানাতে আমরা দোয়া এবং এক মিনিটের নিরবতা পালন করতাম। কিন্তু বিদেশে সেটি পালন হয় একটু অন্য ভাবে, মোমবাতি জ্বালিয়ে। সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১ এ টুইন টাওয়ারে হামলার পর আমরা দেখলাম সেখানে এটা করা হলো। বেশ জাতি জেনে গেলো। এরপর বিভিন্ন ভাবেই আমরা টিভিতে বিভিন্ন বিষয়ে এমন দেখেছি। কিন্তু এটা apply করবার মত জায়গা আমরা পাই নাই। পেলাম শাহবাগ আন্দোলনে! ব্যাস, সবাই মোমবাতি জ্বালিয়ে দাড়িয়ে গেলাম। এরপর বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে আমরা এটা করেই চলেছি।

কয়েকদিন আগে দেখলাম হাতির ঝিলে বিদেশের একটা ব্রিজের অনুকরণে কারা জানি তালা ঝুলানো শুরু করেছে। এটাও কপি পেষ্টের অন্যতম আর একটি উদাহরণ। আইস-বাকেট চ্যালেঞ্জ, লাল-গোলাপী প্রোফাইল পিকচার, Year in review সহ বিভিন্ন বিষয়ে আমরা কপি পেষ্ট দেখেছি।

আজকে প্রথম আলোর একটি নিউজে চোখ আটকালো, লেখার টাইটেল “সোনামণিদের পোশাকেও সিরিয়ালের দাপট“। বিষয়টাকে অনেকে ফান হিসাবে নিতে পারেন, অনেকে এটাকে খারাপ ভাবে দেখতে পারেন। কিন্তু কোথায় যাচ্ছি আমরা? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা একটা ম্যাসেজ দিয়েই রাখতেছি যে তুমি যাই কর, তোমার জীবনে ভারতীয় সিরিয়ালের ছোয়া লাগাতেই হবে! এই বাচ্চা গুলি যখন বড় হবে, তখন কিন্তু তারা এই রকম ধারণা নিয়েই বড় হবে। অনেকে অবশ্য এটা নাও মানতে চাইতে পারেন, তাদের জন্য নিচে একটা উদাহরণ দিচ্ছি।

বেশী দূর না, কক্সবাজারে তো আমাদের যাওয়া হয়, ওখানে গিয়ে ওখানকার কাউকে জিজ্ঞাসা করুনতো রাত্রেবেলায় বিচে থাকলে কিংবা রাস্তায় একলা ঘুরলে ছিনতাই হয় কি না। উত্তর পাবেন “না”। কিন্তু ঢাকা বড় হওয়া কিংবা ঢাকায় কয়েকবছর আছে এমন একটা ছেলেকে এই প্রশ্ন করেন উত্তর আসবে এমন ভাবে যে রাস্তায় রাত্রে বের হলেই ছিনতাই হয়। এবার একটা কাজ করেন; ঢাকার এই ছেলেকে কক্সবাজারে; এবং কক্সবাজারের ঐ ছেলেকে ঢাকায় ছাড়েন। ঢাকার ছেলে কক্সবাজারে গেলেও ভয়ে রাত্রে বাইরে থাকবে না; আর কক্সবাজারের ছেলে ঢাকার রাস্তায় ঘুরতে ভয় পাবে না।

এর সহজ ব্যাখ্যা হচ্ছে একটা মানুষ কেমন মন নিয়ে বড় হয়েছে তাই। আমি শ্রীমঙ্গল ভ্রমণের সময় দেখেছিলাম অস্ট্রেলিয়ান এক মেয়ে রাত ৪:৩০ মিনিটে একলা অন্ধকার রাস্তায় হেটে যাচ্ছে; যেখানে আমার দেশের মেয়ে ভুলেও এই কাজ করবে না। কারণ ঐ একটাই; ছোট বেলা থেকে সে কি মন-মানসিকতা নিয়ে বড় হয়েছে।

আমাদের দেশে প্রগতিশীল কিছু মানুষের সাথে এইগুলি নিয়ে কথা বলতে গিয়েছি। তাদের কথার একলাইন সামারী করলে দাড়ায়, বোরকা ঠেকাও; অন্য কিছুতে সমস্যা নাই। এই প্রগতিশীল মানুষের সাথে এখন আমরাও আস্তে আস্তে মিশে যাচ্ছি। কিন্তু কি হবে এর পর? ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ডিজাইনাররা কি ভাত পাবে? পাবে না; কারণ আজকে আমরাই কপি পেষ্ট করে যাচ্ছি; এবং আমাদের পরবর্তি প্রজন্মকে শিখিয়েও যাচ্ছি।

আসেন না; আমি, আপনি, আমরা একজন দুইজন করেই দেশের সংস্কৃতি ধরে রাখি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *