আমার আফসোস!

আফসোস! মাঝে মধ্যে হয় নিজেকে নিয়ে, আর মাঝে মধ্য হয় অন্যদের নিয়ে। যখন অন্য সবাই ব্লেইম করে যে আমি কিছু পারি না, কিছু করি না, কিছুর যোগ্য না, তখন আফসোসটা হয় নিজেকে নিয়ে। আর যখন নিজে বুঝতে পারি যে অন্যেরা যা বলে তা আসলেই না ভেবে বলে তখন আফসোসটা হয় তাদের জন্য। কখনও আফসোস হয় সিষ্টেমের জন্য, আর কখনও বা এই সিষ্টেমে পড়ে যাওয়া মানুষগুলির জন্য।

ফেসবুক জীবনে আমার আফসোস একটা, সেটা হল আমি আমার ফ্রেন্ডলিষ্টের কাউকে দেখিনি যে ভাল আছে। এর আগের লাইন লেখার পর আমার ওয়ালে একটু ঢু মেরে আসলাম (এখানে দেশী এবং বিদেশী সব রকম বন্ধুদের পোষ্ট কাউন্ট করা হয়েছে), শেষ ৫০টা পোষ্টের মধ্যে ভাল নাই সরসরি বুঝিয়েছে ২৭ জন, মরে যেতে ইচ্ছা করতেছে বুঝিয়েছে ২ জন, নিজ দেশের সরকারের উপরে ক্ষেপে আছে ৫ জন, প্রেম ছ্যাকা খাওয়া ৪ জন আর বাদ বাকি ১২ জন আছে অন্য কিছু নিয়ে। কিছু কিছু মানুষের (বিশেষত কিছু নাম করা মেয়েদের****) স্ট্যাটাসে কোন ভাল খবর আজ পর্যন্ত দেখি নাই। উফ, মরে যেতে ইচ্ছা করেছে, এই ঢাকা শহরে আর ভাল লাগে না, মানুষকে বিশ্বাস করা যায় না, মরে গেলেও আর প্রেম করব না, ধ্যাৎ কিচ্ছু ভাল লাগে না, বোরড, লাইফ সাকস ইত্যাদি ইত্যাদি। আর কিছু উৎসাহী লোক দেখে কেন, কি হইছে, আমারে বল হ্যান ত্যান করতে করতে ঝাপায় পড়ে। আফসোস এই উফ-আহ করা লোকদের জন্য আফসোস যারা তাদের ভাল রাখার চেষ্টা করে কমেন্ট করে তাদের জন্য।

**** নাম করা বলা হয়েছে কারণ এদের প্রত্যেকের সাবস্ক্রাইবার ১০০০+

এই সুযোগে একটা কনফেশন করি, আমি খুব বেছে খুটে বেশ কিছু মানুষের ভাল করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু খুব খুব কাছ থেকে মিশে বুঝেছি যে আসলেই এই ধরনের লোক নিজে ভাল থাকে না, অন্যকেও ভাল থাকতে দেয় না। বিশেষ করে মেয়েদের প্রতি এখন আমার একটা ক্ষোভ জন্মায় গেছে। মেয়েদের যদি একটু সঙ্গ দেওয়া হয়, ধরেই নেয় যে ভালবেসে ফেলছি। অনেক আগে কোথায় যেন শুনেছিলাম যে, একটা ছেলে আর একটা মেয়ে ভাল বন্ধু হতে পারে না। ক্যান যেন মনে হয় এরা এইটাই মাথায় রাখে, এবং এইটাই প্রমান করতে চায়। আবার কাউকে যদি ভাল লেগেই বসে, আর সরাসরি বলি, তাহলে তার দাবী দেখলে মনে হয় সে যেন কোন মহারাণী, শুধু তারই ইচ্ছা আছে, আমার কিচ্ছু নাই। বেশ কিছু সময় চিন্তা করে এখন এই সব লোক থেকে মাফ চাই। যাদের সঙ্গ দেবার চেষ্টা করেছি, তাদের কাছে মাফ চাই, আর না। এরপর মরে গেছেন শুনলে কবরে মাটি দিয়া আসব, কিন্তু হাসপাতালে ভর্তি হলে দেখা করতে যাব এমন গ্যারান্টি নাই। এই আফসোসটা কি আপনাদের জন্য করব, নাকি নিজের জন্য করব বুঝে পাচ্ছি না। আপনারাই ডিসাইড করেন। আর মনে মনে যদি বলেই ফেলেন যে, টাইম নাই। তাইলে আফসোসটা আপনার জন্য, কারণ আপনি এই ‘টাইম নাই বলবেন তা আগেই ধরে ফেলছি।

সুতরাং কথা হল, কারও দুঃখ কষ্ট থাকলে, শফিউল থেকে ১০০০ হাত দূরে থাক।

আফসোসের আরও কারণ আছে। একটা সিষ্টেমের প্রতি আমার বড়ই আফসোস, সেটা হল আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা। কিছু মানুষ শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কোন ভূল পান না। তারা জানেন যে তাদের সন্তানরা ঠিক মত পড়ছে না। অন্যের সন্তান ভাল করছে, আর আমার সন্তান করছে না মানেই আমার সন্তান পড়ালেখার প্রতি আগ্রহী না, ফাঁকিবাজ ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার কিছু মানুষ আছেন শিক্ষা ব্যবস্থার ভূল ধরতে পারলেও সেটা নিয়ে উচ্চাবাচ্য করার কোন চেষ্টাই চালান না। বলেন, কি আর করব? আর কিছু মানুষ আছেন, যারা সিষ্টেমের মধ্যে থেকেও সিষ্টেমের বিপরিতেই চলেন। আমরা তাদের বলি “exception”, তাদের ফলো করা আমাদের মানায় না। আবার এই সিষ্টেমের সিষ্টেমেও আছে ঘাপলা। ক্যামন? ধরেন আপনি আমি এই লেখাপড়ার সিষ্টেমের মধ্যে ভূল ধরলেও মেনে নেই যে আমেরিকা, ইংল্যান্ডের মত দেশ গুলির সিষ্টেম কত না জানি ভাল। কিন্তু ঐখানে গিয়ে দেখেন, ঐখানের মানুষের মধ্যেও ঠিক আমাদের মতই ক্ষোভ।

তবে আমার সব থেকে বড় যেই ক্ষোভ আমাদের দেশের লেখাপড়ার সিষ্টেম নিয়ে, সেটা হল আমার দেশের লেখাপড়া আমাদের শুধুমাত্র দাস বানাতে চায়, এইটাই শিক্ষা দেয়। আমি আমার প্রায় ২০ বছরের পলালেখার জীবনে একজন শিক্ষক শিক্ষিকাকে মনে করতে পারি না যিনি বলেছেন যে এইটা শিখলে বা এইখানে গেলে বা এইটা দেখলে বা এইটা করলে তুমি একজন ব্যবসায়ী হতে পারবে। বরং সব, একদম সব শিক্ষককে দেখেছি বলতে যে এইটা করলে, এই রেজাল্ট করলে হ্যান হইলে, ত্যান হইলে তুমি ভাল চাকরী পাবা। এতে করে কি হয়, ছোট বেলা থেকেই চাকরীর দিকে একটা ঝোঁক থাকে। সেই ঝোঁক নিয়ে বড় হতে হতে আমাদের মাথার মধ্যে শুধু চাকরীই ঘুরে। কেউ যদি চাকরীর দিকে না গিয়ে ব্যবসায়ের দিকে যেতে চায় তাহলে মানুষ পারলে তাকে আকঁড়ে ধরে ঠেকায়। কিন্তু আজ পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারে নাই যে যদি চাকরীই ভাল হবে, তাহলে কিছু মানুষ কেন ব্যবসা করে যে কোন চাকুরীজীবির থেকে বেশি বড়লোক।

আপনারা অনেক জ্ঞানীগুনি, শিক্ষিত, জানা লোক আমার প্রোফাইলে আছেন। যাদের বিশাল একটা অংশ আমাকে সব সময় উপদেশ দেন যে, শফিউল চাকরী কর, চাকরী ছাড়া কিছু করতে পারবি না। ব্যবসা তোর জন্য না। তাদের প্রশ্ন করি, জীবনে কয়টা কেইস স্টাডি পড়েছেন, দেখেছেন বা শুনেছেন যা কোন চাকুরীজীবিকে নিয়ে বানান, আর কত শত হাজার কেইস স্টাডি আছে যা কোন না কোন উদ্দ্যোগতাকে নিয়ে লেখা। আমার মনে হয় এই ফেসবুকের মালিককে নিয়ে যত শত কেইস স্টাডি আছে তা পৃথিবীর সব চাকুরীজীবিকে নিয়ে করা কেইস স্টাডির থেকেও অনেক বেশি।

ছিলাম আফসোসের কথায়, চলে গেলাম কোথায়। লাইনে থাকতে পারি না, এইটাও কম আফসোসের বিষয় না। আমি ভার্সিটির শুরু থেকে যাদের দেখে আসছি, যাদের কয়েক জনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম বেশ বুঝমান হিসাবে, আজ তাদের সাথে আমার হিসাব মিলে না। খুব কাছে থেকে দেখা এক বন্ধু মাঝে একদিন বলল যে ‘আকিজ বিড়ি বিক্রি করে বড় হতে পারে, কিন্তু সেই যুগ আর নাই। এখন চাকরীই সব, ব্যবসা না।’ এই বন্ধুকে নিয়ে আফসোস হয়। এর পর আমার পরিচিত এক মেয়ে, ভার্সিটির ছোট বোন, কয়েকদিন আগে আমাকে হঠাৎ বলল, ভাইয়া, এইসব ব্যবসা ব্যবসা করে কি হবে? তার থেকে চাকরী করেন। ব্যবসায় কোন লাভ নাই। তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম যে তোমার কম্পানির যে মালিক সে কি ব্যবসা করে না চাকরী করে, আর সে কি বেশি ইনকাম করে নাকি অন্যরা বেশি করে? পরে তার কোন উত্তর আমি পাইনি। এইটাও একটা আফসোস।

কিছুদিন আগে এক বড় ভাই ফোন দিলেন। আমার জন্য বিশাল একটা অফার নিয়ে। তিনি আমাকে বললেন একটা কম্পানিতে একজন লোক খুজঁছে, যেই লোককে যাই বলা হবে সে এটলিষ্ট পারবনা বলবে না। তিনি এমন কেউ বলতে আমাকে খুঁজে পেয়েছেন। কথাটা শুনে প্রথমে ভাল লাগলেও পরে থতমত খেলাম। কারণ উনি আমাকে বলছেন এই কম্পানিতে চাকরী করতে, এরা নাকি এত বেশিই বেতন দিবে যা আমি এখন ইনকাম করি না। উনাকে নিয়ে আমার আফসোস এই জন্য যে উনার সাথে পরিচয়ের প্রথম থেকে দেখেছি যে উনি আমাকে ব্যবসায় উৎসাহী করতেন, এবং নিজেও বলতেন যে উনিও চাকরী পছন্দ করেন না, পছন্দ করেন ব্যবসা। হয়ত জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়ে উনার ধারণা পরিবর্তন হয়ে গেছে। সেটাও আফসোসের বিষয়, কারণ উনি fight back করার কথা হয়ত চিন্তাতেও আনেন না।

সব শেষ আফসোসটা নিজেকে নিয়ে করে যাই। আমি আমার খুব খুব খুব কাছের কিছু মানুষের সাথে সব সময়ই অন্যায় করি। তাদের কোন ইচ্ছাই ঠিক মত আজও পুরোন করতে পারিনি। হয়ত পারবও না কোনদিন। আমার আপনা বড় ভাই, তার মত ভাই আমি নিজের চোখে দেখিনি। কিন্তু আমি কখনই পারিনি এই মানুষটাকে এতটুকু শান্তি দিতে। আমার আপু (ভাবী), পৃথিবীর শ্রেষ্ট ভাবী বললেও তাকে তার সম্মানটা দিতে পারব না। ভাবীকে এতটাই আপন মনে করি যে এখনও তাকে ভাবী ডাকতে পারি নাই, আপু বলেই ডাকি, ঠিক যেন আপন বোন। ছোট বোন, যাকে শুধু জ্বালাতন উপহার দিতে পারছি, এই লেখা যখন লিখছি, তার আগের করা ওয়াদাটাও ঠিক রাখতে পারিনি। বোন শেফা, যে আমার প্রতিটা কাজেই হতাশ এবং বিরক্ত। কারণ জানি, শেফার চোখে আমি যা, আসলে আমি হয়ত তা নই। বাবা-মা, তাদের কথা কিছু বলতে চাচ্ছি না। শুধু এতটুকুই বলব, পৃথিবীতে যেন আমার মত করে কোন ছেলে বা মেয়ে তার বাবা-মা কে এত কষ্ট না দেয়, তাদের একটা ইচ্ছাও কখনই পুরোন করতে পারিনি।

বাবা-মা, ভাইয়া, আপু (ভাবী), ছোটবোন, শেফা: সবার কাছে এতটুকু বলব, আমি কারও মনের মত হতে পারিনি, এটা হয়ত আমার অপারগতা, কিন্তু এমন না যে আমি চেষ্টা করি নি। তবে শেষ পর্যন্ত হয়ত কিছু একটা করব যা সবাইকেই কষ্টগুলি ভুলিয়ে দিবে।

রুমি, হাবিব এবং আহাম্মেদ উল্লাহ ভাইকে ধন্যবাদ, সব সময় পাশে থাকার জন্য।

পূর্বপ্রকাশিত: আমার ফেসবুক নোট এ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *