পড়ো পড়ো পড়ো – মুনির হাসান

এই লেখাটাকে ঠিক বই রিভিউ বলা যাবে কিনা বুঝতে পারছি না, তবে মিশ্র কিছু একটাতো হবেই। আমার জীবনে আমি কখনও হাতের লেখা ভালো করতে পারি নাই, তবে যখন লিখি, তখন মনে হয় সুন্দরইতো হচ্ছে, কিন্তু রিভাইস দিতে গেলে বুঝি আমিই আমার হাতের লেখা বুঝতে পারছি না। আর অনলাইনে যে সব লেখা লেখি করি, সেটার জন্যও এই থিউরি প্রযোজ্য। আল্লাহ জানেন “মুনির স্যার” শেষ পর্যন্ত এটা পড়বেন কি না!

মুনির স্যারের সাথে পরিচয় ২০১১ বা ১২ সালে। প্রথম দেখা অবশ্য তারও আগে। কোন একটা বিতর্ক উৎসবে উনি “ডিজিটাল বাংলাদেশ” নিয়ে নানান কথা বার্তা বলেছিলেন, যদ্দুর মনে পড়ে আরকি। পরিচয়ের পর কথা হবার পরই বুঝেছি আমারমত নাদানের নাম উনি মনে রাখবেন এই যোগ্যতা কখনও হবে না। তবে কি করে কি করে স্যার এখন আমার নাম জানেন, সেটা আমার সৌভাগ্য। ফেসবুকে স্যারের প্রায় প্রতিটি পোষ্টই পড়ি, আসলে নোটিফিকেশন অন করে রাখা, স্যার পোষ্ট করলেই ফেসবুক আমাকে জানান দেয়। উনার লেখা অনেক কিছুই পড়েছি। তাই উনি যখন ঘোষনা দিলেন “পড়ো পড়ো পড়ো” নামে উনার একটা বই বের হবে, এবং যখন প্রি-অর্ডার শুরু হলো তখনই আমি অর্ডার করে রেখেছি। তবে বই পাবার পর বিভিন্ন ডামাডোলে* পড়া হয় নাই পুরাটা; ঠান্ডা ব্রেইনে পড়বো বলে। গতকাল বইটা শেষ করে আবার উল্টে পাল্টে দেখলাম। বইয়ের রিভিউয়ে আসি।

প্রথমেই বলি, বইটা কেন পড়বেন? সোজা বাংলায় বলতে হয়, মুনির হাসান স্যারকে আরও কাছ থেকে জানার জন্য পড়তে পারেন, কেন অন্য বই পড়বেন সেটা জানার জন্য পড়তে পারেন আবার এমন একজন আধুনিক চিন্তা চেতনার মানুষ কিভাবে আজকের “মুনির হাসান” হলেন সেটা জানতে পড়তে পারেন। আমার পড়ার মূল আগ্রহটা ছিলো এই মানুষটাকে আরও ভালো ভাবে জানার জন্য। স্যারের সাথে পরিচয়ের পর থেকে বিভিন্ন ভাবে তার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছি, সেই মানুষটা কিভাবে অনুপ্রাণিত হয়েছেন সেটা জানতে পারাটা বলা যায় ডাবল বোনাস!

স্যারের মুখে একটা কথা অনেকবার শুনেছি, আমরা এখন বই পড়া জাতি থেকে স্ট্যাটাস পড়া জাতিতে পরিনত হয়েছি। উনার পুরা বইয়ে বারবার উনি নিজের বই পড়ার আগ্রহ, সেটার জন্য সকল চেষ্টার কথা যেভাবে বলেছেন, এখন মনে হয় একটা টাইম ম্যাশিনে করে পিছনে ফেরৎ চলে যাই, আবার শুরু করি। ভাবা যায়, একটা মানুষ কতটা বই পাগল না হলে একটা বিশ্ব বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বই কি থাকবে সেটা একজন ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করা হয়? “পড়ো পড়ো পড়ো”তে স্যার বার বার ঘুরে ফিরে, পড়বার কথাই বলেছেন। আর যারা পড়তে চায়, তাদর জন্য শেষে যেই চমকটা স্যার রেখেছেন সেটার জন্য আমি সামান্যতমও প্রস্তুত ছিলাম না। এত্তো বড় একটা পড়ার লিষ্ট দিয়েছেন।

সাহিত্য কেন্দ্রে স্যারের সাবস্ক্রিপশন নেবার কথাটা উনার মুখেই আগে শুনেছি, আগেই বইয়ের অংশ বিশেষ তার ফেসবুক থেকে পেয়ে জেনেছি তার প্রথম লেখা ও সম্পাদনার কথা। তবে তার পড়ার এই আগ্রহ বা নেশার পিছনে তার মায়ের ভূমিকার কথা জানা ছিলো না। নেপোলিয়ানের Give me an educated mother, I shall promise you the birth of a civilized, educated nation, কথাটা যে কতটা যথার্থ তা এই বইয়ে মোটামুটি স্পষ্ট।

২০১৭ সালের মোটামুটি একটা হিডেন ইসতেহার ছিলো যে ৪০টা বই অন্তত পড়বো, এখন মনে হচ্ছে ৫২টা বই কম হয়ে যাবে, তবুও সেটা করতে হবে।

আমাদের ছাত্র-রাজনীতি বিমূখিতা নিয়ে কিছু চিন্তা এই বই পড়বার পর আমার মাথায় ঘুরছে। বর্তমান সময় এসে আমি-আমরা রাজনীতি করাটাকে, আন্দোলন করাটাকে বেশ খারাপ চোখে দেখি। নিজেরা যেমন সরাসরি রাজনীতির সাথে জড়াতে চাই না, অন্য কেউ জড়ালে তাকেও বাঁধা দেই; কিন্তু এই বই পড়ে আসলে এতটুকু অনুধাবন করেতে পেরেছি যে আমরা কি ভুলটা করছি! আজকে যারা শিক্ষিত বলে দাবী করি, তাদের ভবিষ্যতে চালিয়ে নিয়ে বেড়াবে আজকের নতুন নেতারাই। অর্থাৎ আজকে যাকে আমি হয়ত পছন্দ করছি না রাজনীতিক নেতা হিসাবে, আগামীকাল সেই হবে আমার নেতা, আমি হয়ত অনেক খারাপ কিছুর জন্য তাকে দোষারোপ করবো, কিন্তু ভুলটার শুরু করেছি আমিই।

বইটা না পড়লে জানাই হতো না যে “বুয়েট”এর মত কঠিন জায়গায় মানুষ কিভাবে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে বিশ্বাবিদ্যালয় ও দেশের জন্য কিছু করতে পারে। লেখা পড়া করা ভালো ছাত্র মানে এই না যে অন্য কিছুতে সময় দিতেই পারবে না।

বইটা পড়বার সময় একটা মজার অভিজ্ঞতা লাভ হয়েছে। সাধারণত সবাই বই পড়তে পড়তে বইয়ে পড়া দৃশ্যগুলি মাথার মধ্যে তৈরী করে নেন। তবে এই বইটা পড়তে গিয়ে বার বার কেন যেন মনে হয়েছে দৃশ্যেতো আছিই, সাথে স্যার যেন হাত নেড়ে তার স্বভাব সুভল ভঙ্গিতে কথাগুলি নিজের মুখেই বলছেন। স্যারকে যারা চিনেন, তারা আমার সাথে একমত হবেন আশাকরি। বইয়ের লেখার স্টাইলটা সম্পূর্ণ উনার কথা বলার ধরণের সাথে মিলে যায়।

সব শেষে এটাই বলবো, বইটা আমাদের পড়া উচিৎ। হাজারো তরুনকে যেই মানুষটা চাকরী না খুঁজে চাকরীদাতা হবার মত কাজে উৎসাহ দিয়ে চলেছেন, দেশে বিজ্ঞানের বিপ্লব নিয়ে কাজ করে চলেছেন, তরুন প্রজন্মের পক্ষে কথা বলবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তার পিছনের ইতিহাস না জানলে আসলে তার সাথে একাত্বা হওয়া সম্ভব নয়। আর এই বই মুনির হাসান স্যারের সাথে একাত্ব হবার একটা সহজ পোর্টাল।

পড়ো পড়ো পড়ো – কিনতে চাইলে এখানে ক্লিক করে অর্ডার করতে পারেন।

* স্যার তাই বইয়ে এই শব্দ এতবার ব্যবহার করেছেন যে এখানে লেখার সুযোগ পেয়ে নিজেকে থামাতে পারলাম না!

One thought on “পড়ো পড়ো পড়ো – মুনির হাসান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *