মা তো মা’ই; আপন আর সৎ হয় নাকি?

মা তো মা’ই; আপন আর সৎ হয় নাকি? প্রশ্নটা করবার একটা যৌক্তিকতা যে আমাদের দেশ এবং সমাজ ব্যবস্থার কারণে চলে আসে। বাংলাদেশ বা দক্ষিন এশিয়ার দেশ গুলির সৎ মা এবং পশ্চিমা বিশ্বের step mom এর অর্থগত দিকে একই হলেও বাস্তবে এটা পুরোটাই ভিন্ন। আমাদের দেশে সৎ মা বলতেই ধরে নেওয়া হয় যেন খুবই খারাপ কিছু। আমরা মুখে বলবার সময় বলেই থাকি যে কেউ কেউ আলাদা আছে, কেউ কেউ ভালো আছে; কিন্তু চিন্তা করতে গেলেই সৎ মা বিষয়টাই ভয়ঙ্কর। পশ্চিমা দেশ গুলিতে তারা ছোট থেকেই বড় হয় নিজের উপর নির্ভর করতে শিখে, আর আমাদের এখানে পরিবারের উপর নির্ভর করে বড় হতে হয়। যার ফলে একটা broken family এর সংগা বাংলাদেশ আর আমেরিকায় সম্পূর্ণই আলাদা হয়ে যাবে।

তত্ব কথা বলতে এই লেখা না। আসলে এই একটু আগে আমার দেখা একটা ঘটনা শেয়ার করতেই লেখা। তাই আর বাড়তি বকবক না করি।

একটা কাজে প্রেসক্লাসের ঐদিকটায় গিয়েছিলাম। সেখান থেকে কাজ শেষে কল্যানপুরে আসবার জন্য ট্রান্সসিলভা বাসে উঠে তিন সীটের একটা সীটে জানালার পাশে বসলাম। এর পর পর একটা মেয়ে উঠলো একটা বাচ্চা নিয়ে। কোথাও এক সাথে দুই সীট না থাকবার কারণে তারা আমার পাশে এসে বসলো, এবং আমাকে অনুরোধ করলো করিডোরের পাশের সীটে আসতে। ঠিক ঠাক হয়ে বসেছি, আমি করিডোরে, বাচ্চাটা আমার পাশে, আর তার পাশেই ঐ আপু। বসতে না বসতেই আপু ঐ বাচ্চাকে কাতুকুতু দেওয়া শুরু করলো, আর বাচ্চার সে কি হাসি।

দুই জনে মিলে চরম আনন্দ। একটু পরে বাচ্চাটা একটু রাগ দেখিয়ে বলল, “আমার সব গুলা ফ্রেন্ডের থেকে তুমি দুষ্ট। আর ফ্রেন্ডরা আম্মুদের ভয় পায়, আর তুমি আমারে কাতুকুতু দাও!”

কথাটায় একটু চমকেছিলাম। কারণ ঐ আপুর বয়স বেশী হলে ২২-২৩ হবে; আর বাচ্চার বয়স কম করে হলে ১০। বাচ্চার বড় আপু হতে পারে, কিন্তু আম্মু হয় কি করে? বাচ্চাটা আরও কিছু কথার মধ্যে তাকে বার বার আম্মুই বলছিলো। যাই হোক, রাস্তায় বেশ জ্যাম ছিলো, কিছু সময় পর বাচ্চাটা ঘুমিয়ে গেছে। কৌতুহল চাপাতে পারছিলাম না, আবার অপরিচিত একজনের সাথে হুট করে কথা বলবো, এটাও কেমন লাগছিলো।

বারবার বাচ্চাটার দিকে তাকাচ্ছি দেখে ঐ আপুটাই জিজ্ঞাসা করলেন, “আমার বাচ্চাটা কিউট না?” বলার অপেক্ষা রাখে না যে আসলেই বাচ্চাটা কিউট। এবার একটু সুযোগ পেয়ে মুখে অবাক অবাক ভাবটা ধরে রেখে প্রশ্ন করলাম যে এ কি সত্যিই আপনার বাবু? উনি বেশ হাসি দিয়ে বললেন, “সবাই অবাক হয়। আসলে আমি ওর আসল আম্মু না, মানে আমি জন্ম দেই নাই।”

এরপর বেশ কিছু কথা হলো। জানলাম যে এই বাবুটার জন্মের ২ বছর পর তার আসল (!?) মা তারই এক পুরাতন প্রেমিকের সাথে দেশ ছেড়েছেন। ওর বাবা প্রথমে চেয়েছিলেন একলাই বাচ্চাকে মানুষ করতে। কিন্তু কাজের জন্য তাকে দেশের বাইরে যেতে হয় ৬মাসের জন্য। এই ফাঁকে তার (বাবার) বাবা-মা তার বিয়ে ঠিক করেন এবং ফোনে বিয়ে দেন।

ঐ লোক যখন বাংলাদেশে আসে, তখন তিনি জানতে পারেন যে এই মেয়েকে জানানোই হয়নি যে তার একটা ছেলে আছে; কিন্তু তার বাবা-মা বলেছিলো যে সব জানানো হয়েছে। এটা নিয়ে বে কিছুদিন ঝামেলার পর এক সময় মেয়ের পরিবার মেনে নিতে বাধ্য হয়, গরীব পরিবার, মেয়ের আবার বিয়ে হবে কি হবে না সেটা নিয়েই তারা সন্দিহান। মেয়ে বরের সাথে ভালোই ছিলো, কিন্তু গলায় বিধে থাকা কাটার মত ছিলো এই বাচ্চা।

একদিন সকালে ঐ আপুটা ঘুম থেকে উঠে বাবুর ঘরে ঢুকে দেখে সে শান্তিতে ঘুমাচ্ছে; হঠাৎই তার মায়া লাগে, ঐ বাচ্চার জায়গায় নিজেকে বসিয়ে নানান জিনিষ ভাবতে থাকেন। নিজেকে প্রশ্ন করেছিলেন যে তিনি যে বাচ্চার সাথে খারাপ ব্যবহার করছেন, সেটার জন্য বাচ্চার অপরাধ কি? ও তো সেধে এই ঝামেলা ঘাড়ে নেয় নি, ও তো কখনই চাইতো না ওর মা দূরে সরে যাক। এরপর আর বাচ্চা গলায় বিধে থাকা কাটার মত মনে হয় নি; মনে হয়েছে যেন এই বাচ্চাই তার সব।

আপুটা যখন কথা বলছিলেন, তার চোখের কোনায় পানি জমে ছিলো, বারবার বাচ্চার মাথায় হাত বুলাচ্ছিলেন। মুখের মধ্যে ভালোবাসার স্পষ্ট ছাপ। এমন একটা দৃশ্য যার দিকে তাকিয়ে থাকা যায় হাজার বছর।

আমি এমন পরিবারও দেখেছি যেখানে সৎ মা বলতে আমরা যা বুঝি, তাই। আবার এমন পরিবারও দেখেছি যেখানে বাউরের কেউ সৎ মা বললেই ছেলে মেয়েরা ক্ষেপে যায়।

বাস থেকে যখন নামছিলাম, তখন একটা প্রশ্ন জাগলো, আসলে আসল মা কে? জন্ম দিলেই সে আসল মা? নাকি এমন সৎ মা আসল মা? প্রশ্ন জাগলো, ঐ আসল (?!) মায়ের কি কখন এই বাবুটার কথা মনে পড়ে? কখনও কি ইচ্ছা করে এই বাবুটার চুলের মধ্যে হাত দিয়ে বিলি কেটে দিতে? কখনও কি ইচ্ছা করে খুশি আন্দে খুনসুটি খেতে?

পৃথীবির সকল পরিবার সুখী হোক।

2 thoughts on “মা তো মা’ই; আপন আর সৎ হয় নাকি?

  1. স্বার্থপর এই পৃথিবীতে মায়ের মত স্বার্থহীনভাবে আর কেইবা ভালবাসতে পারে। আর আমরা কইজনেই তা বুঝতে পারি। বুঝে উঠতে আমরা ততদিনে হয়ত হারিয়ে ফেলি জীবনের সবচেয়ে ভালবাসার মানুষটিকে। তাইত মা তো মা’ই; আপন আর সৎ হয় নাকি। সবার উচিত মাকে বেশি করে ভালবাসা এবং তাঁর যত্ন নেয়া।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *