এতোই যদি মজা পাও, শেয়ারের সময় পাও ক্যামনে?

এতোই যদি মজা পাও, শেয়ারের সময় পাও ক্যামনে? ঠিক এই কথাটাই আমি বারে বারে মানুষকে জিজ্ঞাসা করি। সঠিক কোন উত্তর দিতে পারে না কেউ। এ্যউ্য করে একটু করে বেশ একটা লজিক দেখায় যে ভালো হইতেছিলো দেখেইতো শেয়ার করছি। এটা নিয়েই কিছু কথা বলবো, কারো কারো কাছ বিষয়টা বা কথা গুলি ফালতু মনে হতে পারে, কিন্তু পুরো লেখাটা একবার পড়বার অনুরোধ করছি। আর সব শেষে নিচের ভিডিওটি দেখবার অনুরোধও করছি।

একটা ঘটনা

এইতো, গত জুলাই ২০, ২০১৪ তারিখে বাংলাদেশ ফ্যাটি ক্লাব এর উদ্দোগ্যে আমরা একটা ইফতার পার্টি করলাম। এখন পর্যন্ত একজন মেম্বারও বলে নাই যে ইফতার পার্টিটা ভালো হয় নাই। আমরা যখন খেতে বসছি, তখন ইফতার শুরু শুরু আরকি। বসতে বসতে আজান, সাথে সাথে ইফতার। এই ইফতারের মধ্যে ঘটলো এক ক্যাচাল! ঢাবির টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ার মধ্যে বিশাল মারামারি। ভয়ে অস্থির হয়ে পুরা টিএসসি এর মাঠ ফাঁকা, দৌড়া দৌড়ি লেগে গেছে! খালি আমরা কয়জন বসে আছি (আমাদের মধ্যে দুই জন অবস্যএকটু সাইডে গিয়ে বসছিলো), আর খাবার চিবাইতেছি। এর থেকে আরও মজার বিষয় হলো, সাইফুল তো বলেই বসলো, খালি থ্রিলার বাকি ছিলো, সেইটাও হয়ে গেলো।

আমরা মজা করে চিবুতে থাকলাম, আর দেখতে থাকলাম কি হয়। মূল কথায় আসি, পুরো টাইমে কেউ সেলফি তুলে নাই, কেউ খাবার ছবি তুলে নাই, কেউ এই খাবারের খবরটা পর্যন্ত ফেসবুকে শেয়ারে উদ্দত হয় নাই। কারণ কি? কারণ একটাই, সবাই খাবারটা ইনজয় করছিলো। খাবার দাবার সব শেষ হয়ে যখন চলে যাবো, তখন একটা গ্রুপ ছবি না রাখলেই নয় দেখে ছবি তোলা।

ঘটনা শেষ। আমার মনে হয় সবাই বুঝে গেছেন আমি কি বলতে চাইছি। ইদানিং আমরা বেশি বেশি মাত্রায় সোশ্যাল হতে গিয়ে আসলে জগা খিচুড়ি পাকায় ফেলছি। আমি এখন কিসে মজা পাচ্ছি, সেটা দুনিয়ার সাথে শেয়ার করতে গিয়ে আমার পাশের মানুষটা আমার এই মোবাইলের মধ্যে ডুবে থাকাটাকে পছন্দ করছে কিনা সেটা দেখছি না, বা জানতেও চাচ্ছি না।

আমার ফ্রেন্ড লিষ্টের অনেক মানুষকে দেখি তারা কত ভালো সময় কাটাচ্ছে সেটা শেয়ার করেই চলেছে। কার সাথে সময় কাটাচ্ছে সেটা শেয়ার করে চলেছে। এটার কয়েকটা লজিক আছে আমার কাছে:

  • সে দেখাতে চাচ্ছে যে সে আসলে ভালো আছে
  • সে আসলে অন্য কাউকে জেলাস ফিল করাতে চাচ্ছে
  • সে আসলে ভাল সময় কাটাচ্ছে না, সে তার ফেসবুক নিয়ে থাকতে আগ্রহী
  • সে আসলে জীবনে ভালো সময় কাটায় নাই, আজকে একবার কাটায় আবেগে স্ট্যাটাস দিয়া ফালাইছে

কয়েকদিন আগে একটা মুভির কিছু ক্লিপস দেখছিলাম। কোনো একজনকে ফোন করা হয়েছে, সে ফোন রিসিভ করেছে। পরে সে জানায় যে সে ভালো একটা সময় কাটাচ্ছিলো, তাকে তখন প্রশ্ন করা হয়: If you were enjoying, why did you pickup the phone?

দেখেন, খুব সাধারণ ভাবে চিন্তা করেন। আপনার বর/বউ/গার্লফ্রেন্ড/বয়ফ্রেন্ড/মা/বাবা/বোন/ভাই আপনাকে সাধ করে একটা কিছু বানায় খাওয়াচ্ছে। সে কি চাইবে? সে চাইবে আপনি ঐটা খেয়ে দেখেন, তার সামনে প্রশংসা করেন, কোন সাজেশন থাকলে সেটা বলেন। কিন্তু আপনি কি করলেন, দুই চামচ খেয়ে বাটিটা পাশে রেখে লেগে গেলেন ছবি তুলতে, তারপর সেইটা ফেসবুকে দিতে। ঘটনা এখানে শেষ হলেই পারতো, আপনি অপেক্ষায় থাকলেন কে লাইক দিলো, কে কমেন্ট করলো, সেই কমেন্টের রিপ্লাইতে আপনি কি লিখবেন এই গুলা নিয়ে। আরে বাবা, যে বেচারা আপনার জন্য এত কষ্ট করে বানালো, সে কি মনে করলো? আপনি তো বাটি পাশে রেখেই দিয়েছেন, গরম জিনিষ ঠান্ডা হয়ে গেলো, বা বরফ জিনিষ পানি হয়ে গেলো। সে তো ধরেই নিবে জিনিষটা ভালো হয় নি। আপনি হয়তো তাকে খুশি করবার জন্যই স্ট্যাটাস/ফটো আপডেটটা দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি কি আদৌ খুশি হলেন? আপনি যদি তার চোখে চোখ রেখে বলতে পারতেন যে জিনিষটা আসলেই ভালো হয়েছে, এবং ইয়াম ইয়াম করে দ্রুত চেটেপুটে শেষ করে আরও আছে কিনা জিজ্ঞাসা করতে পারতেন, তাহলে কিন্তু ঐ বেচারা আরও খুশি হতো, হয়তো আপনার কপালে আরও একদিন আরও এক বাটি স্পেশাল খাবার জুটতো!

আসেন, আর একটা উদাহরণ দেই; ধরেন আপনি আপনার বন্ধুদের সাথে গল্প করছেন, এমন একটা জোকস বা ঘটনা মাথায় এসেছে, যেটা বলা শুরু করেছেন; এর মধ্যে একজনের ফোন আসলো, এবং সে ফোনেই হয়ত ১০ মিনিট কাটিয়ে দিলো। আপনি যেমন আপনার ঐ কথা গুলি বলার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন, তেমনি তারাও আবার প্রথম থেকে শুনতে গিয়ে হয়ত বিরক্তই হবে! আচ্ছা, এবার এই ঘটনাটাই অন্য ভাবে চিন্তা করেন। ১০জন বন্ধুর মধ্যে গল্প বলছেন, এবং ৫জন অলরেডি বুঝে ফেলেছে যে আজকে এই গল্প সিরাম জমবে। ঐ ৫জন দ্রুত পকেট থেকে মোবাইল বের করে সে যে ভালো সময় কাটাচ্ছে, সেটা ফেসবুকে শেয়ার করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কেমন লাগবে আপনার?

আপনি যদি সত্যিই একটা আড্ডা, খাবার বা কিছু উপোভোগ করেন, তাহলে আপনি কিন্তু সেটাই উপভোগ করবেন। আপনি কখনও সেটা স্ট্যাটাস আকারে দিতে চেষ্টা করবেন না। যখনই আপনি স্ট্যাটাস আপডেট করতে যাবেন, তখনই প্রমান হবে যে এটার থেকে ঐ স্ট্যাটাস আপডেট আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হোক সেটা মাত্র ৩০ সেকেন্ডের জন্য; কিন্তু আপনি আসলে ঐটাকেই জোর দেন।

আমি জানি, স্ট্যাটাস ফ্রিক লোকজন আমাকে গালি, বকা আরো অনেক কিছুই দিতেছেন। কিন্তু একটু চিন্তা করেন; একটু হিসাব করেন। আসলে আমরা কোথায় যাচ্ছি? একটা আড্ডা দেবার জন্য রেষ্টুরেন্টে বসে ফ্রি wifi খুজি, ফেসবুকে কি হয়েছে সেটা শেয়ার করি, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেই। আমরা কি এতই ফকির হয়ে গেছি যে ফ্রি ওয়াইফাই খুজতে হবে? আমরা কি এতটাই ডিজিটাল-সোশ্যাল হয়ে গেছি যে বন্ধু পাশে বসে থাকলেও তার কথায় কান না দিয়ে তার সাথে হেব্বি ভালো সময় কাটাইতেছি লিখে তারেই ট্যাগ করতে হবে?

আরও একটা ঘটনা

এ ঘটনাটা গতকাল (জুলাই ২৭, ২০১৪) এর। ভার্সিটি এবং কলেজ লাইফের কিছু ফ্রেন্ডের সাথে ভিষণ ভালো একটা আড্ডা হলো। কত কত দিন কেউ কাউকে দেখি না। এক সাথে ইফতার, চা, কফি, ফালুদা, পিজা, কাবাব-পরোটা খাওয়া, কত গল্প করা। আরও কত গুলা ফ্রেন্ডের সাথে দেখা, তাদের ফ্রেন্ডের সাথে পরিচিত হওয়া। যার যার চাকরী বা ব্যবসা নিয়ে কথা বলা কতো কি, ৫/৬ ঘন্টা যেন কর্পূরের মত উড়ে গেলো। ঈদের যে কটা দিন আমরা এলাকাতে আছি দেখা করবো বলে কথা দেওয়া হলো। সব থেকে ভালো লেগেছে, কেউ এই পুরো সময়টা জুড়ে একটা স্ট্যাটাস দেয় নাই, একবার ফেসবুকে ঢুকে দেখে নাই যে ফেসবুকের ভার্চুয়াল দুনিয়ায় কি হচ্ছে। আমরা সবাই ব্যস্ত ছিলাম ভালো সময় কাটাতে।

আমরা কেউই দুনিয়ার সাথে শেয়ার করিনি যে আমরা কি করছি, কেন করছি, কেমন সময় কাটাচ্ছি। তার মানে কি এমন যে আমরা ঐ সময়টা উপোভোগ করি নি? না, মোটেও তা না। বরং আপনি যখন শেয়ার করেন, মনেই দাড়ায় আপনি ঐ সময়টা ভালো ভাবে কাটাবার থেকে দুনিয়াকে কি জানাবেন সেটা নিয়ে বেশি ব্যস্ত; সেটাই বেশী প্রাধান্য পাচ্ছে।

আসেন, অনন্তত আমরা যখন পরিবার-বন্ধু-বান্ধব-আত্মীয়-স্বজন এর সাথে সময় কাটাই, ফোনটাকে পাশে রাখি, একটু এই চেনা পরিচিত মানুষগুলির দিকে তাকাই। যেখানে একজনের বাবা মারা যাবার খবরের স্ট্যাটাসে লাইক দেবার জন্য লোক পাওয়া যায় সেটাকে কাছে টেনে নিয়ে, পাশের মানুষটি যে গলা জড়িয়ে ধরে কাদঁতে পারে তাকে কেন আমরা দূরে সরিয়ে দেই? নিচের ভিডিওটি দেখবার অনুরোধ রইলো।

11 thoughts on “এতোই যদি মজা পাও, শেয়ারের সময় পাও ক্যামনে?

  1. ভাই আমি উঠে আপনার পিছনে চলে গিয়েছিলাম 🙂 … কারন কখন এত কাছ থেকে মারামারি দেখি নাই,আপ্নি ছিলেন বলে অন্তত দৌড় টা দেই নাই 😛

      • শোনেন ভাইজান…. মানুষ ছবি তোলে যাতে পরবর্তীতে এইগুলি স্মরণ করা যায়… এখন কার ব্যাস্ততার দিনে সবার সাথে সব সময় যোগাযোগ করা হয়ে উথে না… ফেসবুক এর মাধ্যমে যদি সবার খজ খবর রাখা যায় তবে সমস্যা টা কোন জায়গায়??? আর ভাইজান ফেসবুকের STATUS option তার মানে তা একটু বুঝায় বইলেন। আমি আমার ফেসবুকের টাইমলাইন কি দিয়ে ভরাবো এইটা একান্তই আমার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। if you dont like, you are free to block or unfriend that person. আর একটা কথা DSLR থাকলে সবারই যেমন সুন্দর সুন্দর প্রোফাইল picture দেওয়ার ইচ্ছা জাগে, ফ্রন্ট camera থাকলে যেমন সেলফি তলার শখ জাগে তেমনি খাইতে বসলে আমার ও ছবি তুলে নেট এ সংরক্ষন করার এবং সবাইকে দেখানর শখ জাগে।
        আর আপনি যেমন আপনার সাইট এ লিখসেন my world, my kingdom. ঠিক তেমনি সবাই নিজের প্রোফাইল এর রাজা। নিজের রাজ্য কেমনে চালাবে অইটা তারেই ঠিক করতে দেন।
        বাংলাদেশের অনেক বিষয় নিয়ে লেখার আছে… অইগুলি সম্পর্কে লিখেন। মানুসের কিছু উপকার হবে আপনার নিজের ও কিছু উপকার হবে।

        • প্রথমত বলবো আপনি আমার লেখাটা পড়েন নাই, খালি টাইটেল দেখে কমেন্ট করেছেন। না হলে এতো বড় কমেন্ট আসতো না।

          তাছাড়া মূল বিষয়টাই বুঝতে/ধরতে পারেন নাই। মানুষ য্যামনে ফেসবুকে বুদ হইছে, তাতে কইরা তো অন্য দিকে তাকানোরই উপায় নাই। ফেসবুক এখন সব খানেই একটা বড় সমস্যা।

          হ্যাপি শেয়ারিং 😉

    • মিয়া আমার তো আপনার শুকনা চেহারার কথা মনে পরলে আজও হাসি পায় 😀

    • নিজেও একসময় করতাম… মানে দাড়ায় এখন আর করেন না। যদি না করেন, তাহলে এটাই ভালো যে আপনি নিজে উপলব্দ্ধী করতে পারছেন।

      ভালো লেগেছে যেনে খুশি হলাম। শুভ কামনা রাইলো, কমেন্ট করবার জন্য ধন্যবাদ। 🙂

  2. প্রতিটা কথা সত্যি… সামাজিক হওয়ার এখন শুধু অভিনয়ই চলে… আমরা এখন অনলাইন ফ্রেমে বন্দী… লিখাটা সুন্দর হয়েছে…।

    • আসলে আমরা সব সময় স্রোতের টানেই ভাসতে পছন্দ করি, কিন্তু কি হারাচ্ছি, তা দেখতে চাই না।

      ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো… ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *