ঈদে বাস ফেইল!

ঈদে বাস ফেইল! ঢাকায় যারা কাজে-আকাজে থাকেন এবং ঈদের আগে বিশাল সিরিয়াল ধরে বাসের টিকিট কাঁটা লাগে তাদের জন্য এই ‘ঈদে বাস ফেইল!’ কথাটা যে কত ভয়ঙ্কর তা বলে বুঝানো যাবে না। আমি জীবনে কখনও কোথাও দেরী করে যাবার কারণে বাস ফেল করেছি এমন রেকর্ড ছিলো না গত বছরে (২০১৪) রোজার ঈদের আগ পর্যন্ত। তবে বাস ফেল করেও ফেল করি নাই! এবং ফেল করেও না ফেল করার ঘটনাটা যথেষ্ট মজার ছিলো আমার জন্য। আজকে সেটাই শেয়ার করি।

ঢাকায় লেখাপড়ার জন্য আসি ২০০৮এ, এই আমার বাড়ি থেকে রেগুলার বের হওয়া শুরু। প্রতিবারই যখন খুলনা থেকে ঢাকায় আসি, আব্বার একটু চিল্লাপাল্লা করা লাগে; কারণ বাস যদি রাত ১০টায় ছাড়ার কথা থাকে, আমি বাসা থেকেই বের ১০টা ৫এ, কারণ আমার ব্যাগ গোছানো শেষ হয় ১০টা ৩এ। এই নিয়ে ক্যাচাল। তবে কখনও বাস মিস করি নাই। বাস আসবার আগেই পৌছে গেছি বাসস্ট্যান্ডে।

কিন্তু গতবছর হঠাৎই সব এলোমেলো হয়ে গেছিলো। ঈদের আগে টিকিট পাইতে এমনিতেই জান শেষ। আর ঢাকা ছাড়বার আগ দিন হঠাৎই এত ব্যস্ততা বেড়ে গিয়েছিলো যে সকাল ৭টায় বাসা থেকে বের হয়ে বাসায় ফিরছিই রাত ২টায়। বাসায় ফিরে রান্না করে সাহরী করে সব ধুয়ে মুছে নামাজ পড়ে বসেছি ব্যাগ গুছাতে। বাস সকাল ৭টায়, তখন বাজে রাত ৫টা। বেশ সময় আছে হাতে। বসে বসে গুছাতে গুছাতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি আল্লাহ মালুম।

বেশ আগে থেকেই কম্পিউটারের টেবিলে বসে, বাসে বসে এমনকি রিক্সায় বসেও ঘুমানোর যে দীর্ঘ্য প্রাক্টিস, তার ধারাবাহিক সফলতায় আমিও বসে বসেই ঘুমিয়ে গেলাম। সকাল ৭টা ৪০এ বড় ভাইয়া ফোন করছে এটা জানতে যে আমি বাসে উঠেছি কি না। সময় দেখে আমারতো মাথা গরম অবস্থা! মাত্র ৪/৫ মিনিটে ব্যাগ গুছিয়ে বাসা থেকে বের হলাম, বাসার নিচেই বাসস্ট্যান্ড। গিয়ে শুনি যেই হানিফ বাস প্রতিদিন রেকর্ড পরিমানে ৩০-৪৫ মিনিট দেরী করে, তারা আজকে ঠিক ৭টাতেই বাস ছেড়ে চলে গেছে! বললো গাবতলীতে গিয়ে হয়ত ধরতে পারলেও পারতে পারি। গাবতলীতে ফোন দিয়ে শুনলাম বাস ছেড়ে চলে গেছে।

পুরাই ধরা, ঈদের বাকি ২দিন, আজকে বাসের টিকিট কই পাবো? কি যেন মাথায় আসলো, একটা সিএনজি নিয়ে সম্পূর্ণ উল্টা রাস্তা (রং সাইডের রাস্তা) ধরে আগাতে থাকলাম। কারণ বাম পাশের রাস্তা জ্যামে পুরাই ব্লক। গাবতলীতে আবার ফোন দিয়ে বাসের নম্বর, সুপারভাইজারের নম্বর নিয়ে নিলাম। সিএনজি যখন সাভার, সুপারভাইজারকে ফোন দিয়ে শুনলাম বাস নাকি তখন ধামরাই ছাড়িয়ে চলে গেছে, কোন জ্যাম নাই। তবুও কি এক অন্ধ বিশ্বাসে সিএনজি নিয়ে আগাতে থাকলাম। নবীনগর এসে ফোন দিলাম, তখন সে বলল তারা নাকি মানিকগঞ্জ। বেশ অবাক হলাম, বাস কি তাইলে ৫০০ কিলোমিটার বেগে চলতেছ! কারণ এতদ্রুত মানিকগঞ্জ যাইতেই পারে না। এবার সারিসারি বাস গুলির দিকে তাকাতে তাকাতে পর পর কয়েকটা হানিফ বাস দেখলাম। এর মধ্যে একটার নম্বর দেখি মিলে গেছে। সামনে তখনও লম্বা জ্যাম!

সিএনজির ভাড়া মিটিয়ে বাসের কাছে গিয়ে আবার ফোন দিলাম, সুপার ভাইজারের কথা তারা এখন ঘাটে পৌছে গেছে। বললাম, ঠিক আছে, এখন দরজাটা খুলেন। সে বলে, মানে কি? আমি বললাম আমি বাসের দরজার বাইরে দাড়ানো। সুপার ভাইজার দরজা দিয়ে যখন বাইরে তাকালো, তার মুখের অবস্থা দেখার মত। সে দরজা খুলবার আগে টিকিট চেক করলো, কোন ভাবে আমাকে না নিয়ে যাওয়া যায় কিনা সেটার চেষ্টা করলো। বেশ জোর করেই বাসে উঠলাম। উঠেই বুঝলাম কাহিনী কি ঘটাইছে।

আমার সীটে আর একজনকে বসাইছে। এখন সুপারভাইজার তাকে যতই বুঝায়, সে বুঝবে না। তাকে টাকা ফেরৎ দিতে চাইতেছে, তাও সে নিবে না; আমার সীটও ছাড়বে না। বেশ রাগারাগীর এক মুহুর্তে আমি তাকে বললাম, ভাই, আমাদের সমস্যার কারণে ক্যান বাসের মানুষ কষ্ট পাবে? আসেন, আমরা তিনজন নিচে গিয়ে আলাপ করে ঠিক করি কি করা যায়। লোকটি উঠে দাড়াতেই আমি সীটে ধপ করে বসে পড়লাম আর বললাম, এইবার আপনাদের দুইজনের সমস্যা, আপনারা দুইজন নিচে গিয়ে আলোচনা করেন কি করবেন।

এর পর বেশ ক্যাচালের পর ঐ লোককে ইঞ্চিনে বসিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। মাঝে ৩ঘন্টা আমি তাকে আমার সীটেও বসতে দিয়েছি। কিন্তু, বাস ফেল করবার কলঙ্কতো আর পড়ে নাই। আমার আব্বা এখনও জানেন না এই ঘটনা।  জানলে কয়েকবার খোটা খাওয়া লাগতো!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *