আপনাকে, হ্যাঁ আপনাকে “ধন্যবাদ”

আপনাকে, হ্যাঁ আপনাকে “ধন্যবাদ”! কেন? কারণ আপনি আসলেই দারুন একটি কাজ করেছেন।

কিছু কিছু বিষয়ে আমি কেন যেন একটু বেশিই লক্ষ করি, একটু বেশিই চোখ চলে যায়। আবার কিছু বিষয়ে আমার এত বেশি উদাসীনতা থাকে যে বড় রকমে ধরা খাই। সঠিক ভাবে বলতে গেলে কাজের জিনিষের খোঁজ নাই, আকাজের জিনিষের খোজটাই একটু বেশী।

রাস্তা ঘাটে যেই জিনিষ গুলি আমাকে খুব টানে তা হল কে কার কি উপকার করল। নিজেতো করি না, অন্য কেউ করলে তা লক্ষ্য করি। আর একটা সহজ বাক্য মুখ থেকে বের হয়ে যায়, ধন্যবাদ আপনাকে।

কারও কাছে ধন্যবাদ বলার কোন মানে নেই, কারও কাছে ধন্যবাদ বলার লোক বহুত আছে, কারও কাছে যেটুকু করেছে তাতে ধন্যবাদের কি আছে, আর কারও কাছে হুদাই টাইম নষ্ট। কিন্তু যাকে ধন্যবাদ দেওয়া হল, তার কেমন লাগে? কখনও হিসাব করেছেন? হয়ত করেন নি, হয়ত করবেনও না। আমি করি, কারণ আমার কাজের থেকে আকাজের সময় বেশি।

এইতো, কিছুদিন আগে গুলশান ১নং এর কাছে দাড়িয়ে একজন ছোলা বিক্রেতাকে লক্ষ্য করছিলাম। আর দশজন ছোলা বিক্রেতার মত তিনিও ফুটপাথের একটা জায়গা দখল করেছেন। তিনিও তার ব্যবসার দিকে তাকিয়ে বিকালের বাড়ি ফেরা মানুষের পথে বাধাঁ দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন, হচ্ছেন হাজার মানুষের বিরক্তির কারণ। প্রায় ১০মিনিট তাকে লক্ষ্য করলাম, এরপর আস্তে করে এগিয়ে গিয়ে তাকে ধন্যবাদ বললাম। কেন? সে মানুষের ক্ষতি করছে বলে? সে কষ্ট করছে বলে?

না, সে তার ঝোলাটার সাথে তিনটা ময়লার ঝুড়ি টানিয়ে রেখেছে। যাতে মানুষ রাস্তায় ময়লা না ফালায়। অনেকেই ব্যবহার করছেও। তাকে ধন্যবাদ দিতেই সে একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। বুঝিয়ে বলতেই সে খুশি হয়ে গেল। চোখের কোনে পানি দেখতে পেলাম। তার ভাষ্য মতে গত ১.৫ বছরেও কেউ তাকে এই ছোট্ট শব্দটি বলেনি। তার কাজটা যে কেউ লক্ষ্য করেছে, এতেই সে মহা খুশি। প্রতিদিন ময়লার ঝুড়ি বাধার সময় সে নিজেকে গালি দেয়, ভাবে হুদাই গাধার খাটনি করছে। তবে আজকে তার এই কাজটা সার্থক মনে হচ্ছে।

এর পর একটু দূরে দাড়িয়ে আবার তাকে লক্ষ্য করতে থাকলাম। সে প্রতি কাষ্টমারকে ছোলা দিয়েই অনুরোধ করছে যেন কাগজটি ঐ ঝুড়িতে ফেলা হয়।

এই “ধন্যবাদ” শব্দটুকু একটা মানুষের ভাল কাজের অনুপ্রেরণাকে একটু হলেও কি বাড়াবে না?

বেশ কয়েক বছর আগের কথা, ২০০৬-৭ হবে। সারাদিন দৌড়ের উপরে থাকতাম। তখন আমি খুলনা থাকি। দৌলতপুর টু খুলনা দিনে প্রায় ২/৩বার আপ-ডাউন করতে হতো। বাহন হচ্ছে বেবি টেক্সি। মাঝে মধ্যেই বেবি টেক্সিগুলি তেল নিতে থামতো। নতুন রাস্তার মোড়ে একটা তেলের পাম্প ছিল, ঐটায় ভীড় প্রচুর থাকতো।

একদিন এক বেবি টেক্সিতে ছিলাম, ঐ টেক্সির ড্রাইভার নেমে গিয়ে তাদের কাছ থেকে পানি চেয়ে খাইল। যারা ঢাকার বাইরে যাননি বা থাকেন নি, তারা হয়ত জানেন না, ঢাকার বাইরে প্রায় সব খানেই পানি কিনতে হয়না, টিউবওয়েল থেকে ভরে আনলেই হয়। তাই ঐ তেলের পাম্পের পানি দিতে কোন সমস্যাই থাকে না। এক কোনায় একটা গ্লাস পড়ে থাকে, সেটা চেয়ে নিয়ে পানি খেলেই হয়।

কয়েকদিন পর পর লক্ষ্য করলাম যে এরা সবাইকেই গ্লাস দিয়ে দেয়। একদিন হাটতে হাটতে ঐখানে গিয়ে ঐ তেলের পাম্পের ম্যানেজারকে ধন্যবাদ দিলাম। কপাল ভাল ছিল বলতে হয়, মালিকও ঐখানে ছিল। হঠাৎ ধন্যবাদ দেওয়ায় দুইজনেই ভ্যাবাচ্যাকা খাইল। পরে বুঝিয়ে বললাম যে তারা যে এই ড্রাইভারদের কষ্ট কমাবার জন্য পানির ব্যবস্থা করতেছে, তাই তাদের একটা ধন্যবাদ পাওনা।

পরদিন সকালে যখন আর একটা বেবি টেক্সিতে করে ঐ তেলের পাম্পে ঢুকলাম, মনটা ভরে গেল। পাম্পের একজন লোক পানির জগ হাতে নিয়ে দাড়িয়ে, সব ড্রাইভার এবং প্যাসেঞ্জারকে পানি ঢেলে দেওয়াই তার কাজ, আর কোন ড্রাইভার বা প্যাসেঞ্জারকে নেমে পানি খেতে হবে না। পুরো গরমের সময়টা তারা এই ভাবে পানি খাইয়েছিল।

এমন ঘটনা আমি নিজে অনেক অনেক দেখেছি। আমি নিজে কখনও এমন ভাল কোন কাজ করিনি, তাই জানিনা যে ধন্যবাদটি পেতে কেমন লাগে, তবে এটা জানি  যেএকটি মানুষকে ধন্যবাদ দিলে নিজের কাছ থেকে কিছুটা হলেও দায়মুক্ত মনে হয়।

শেষ ধন্যবাদটা দিয়ে যাই, আপনাকে, হ্যাঁ আপনাকে “ধন্যবাদ”; কষ্ট করে লেখাটা পড়বার জন্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *