প্রতারণা প্রতারণাই, হোক সে যে উদ্দেশ্যে

কামাল মিয়া লেখা পড়া জানেন না; তার পাশের বাড়ির রমিজ মিয়া তার সেই মূর্খতার সুযোগ নিয়ে তাকে দিয়ে দলিলে টিপসই নিয়ে তার সব জায়গা জমি দখল করলো। এখন আপনিই বলেন, কামাল মিয়া লেখা পড়া জানে না, সেইটার সুযোগ নেওয়াটা কি রমিজ মিয়ার উচিৎ হইছে? না কাজটা ঠিক হইছে? যদি মনে করেন রমিজ মিয়া ঠিক কাজ করছে, তাহলে নিচের লেখা আর পড়বার দরকার নাই। এখানেই ক্ষ্যান্ত দেন; নইলে মেজাজ খারাপ হবে।

আপনি এখনও পড়তেছেন, মানে দাঁড়ায় আপনি কামাল মিয়ার পক্ষে। এবং বলছেন যে রমিজ মিয়া কাজটা ঠিক করে নাই। হ্যাঁ সেটাই স্বাভাবিক। সরকারও বুঝে, জানে, তাই ব্যবস্থা করেছে শিক্ষার; বাধ্যতামলূক করা হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা; আয়োজন করা হয়েছে বয়স্ক শিক্ষা।

আমি সাধারণত রাজনীতি-ধর্ম এগুলি নিয়ে লিখি না। তবে আজ বাধ্য হচ্ছি ধর্ম বিষয়ে লিখতে। আমার ধারণা ইতিমধ্যেই প্রায় সবাই দেখে গেছেন সরকারের এক অন্যরকম প্রচারণা নিয়ে। শহরের বিভিন্ন দেয়ালে “প্রসাব করা নিষেধ” কথাটা লিখেও যখন কাজ হচ্ছিলো না; তখন সরকার আয়োজন করেছে এক নতুন পন্থার। যেহেতু আমাদের দেশ শতকরা ৮০+% মুসলিম এর দেশ, তাই এখানে আরবীর কদরটাই অন্য রকম। আর তারা দেয়ালে একই কথা আরবীতে লিখছে। ফলাফল চমকপ্রদ; সবাই সেখানে প্রসাব করা বন্ধ করে দিয়েছে। আর আমরাও জনতা আনন্দে লাফিয়ে উঠেছি; অসাধারণ আইডিয়া বলে।

এটার সমস্যাটা কোথায়? সমস্যাটা হচ্ছে এই গুলি একটা ধীর প্রসেসের অংশ বলা চলে। যেটার ফল হঠাৎই টের পাওয়া যায় না। কোন রাজনৈতিক দলের নেতা ধর্ষনে ১০০ করলেও আমরা শুধু তাকেই, খুব বেশী হলে তার দলকে গালি দেই। কিন্তু মাদ্রাসার একজন শিক্ষক যদি একজনকে ধর্ষন করে, তখন আমরা প্রথমে গালি দেই তাকে, তারপর হুজুরদেরকে, তারপর মাদ্রাসাকে, তারপর ইসলামকেই! এমন হবার কারণ কি? কারণ আমাদেরকে আস্তে আস্তে বোঝানো হয়েছে যে দাড়ি টুপি খারাপ; এরা খারাপ। নাটক সিনেমা সহ বিভিন্ন ভাবে আমাদের সামনে আস্তে আস্তে এইসব তুলে ধরা হয়েছে; কিন্তু আমরা সেটা বুঝিও নাই। রাজনৈতিক দলের কেউ লাঠি হাতে মিছিল করলে, পুলিশের দিকে হাত বোমা ছুড়লে তা সহিংসতা পর্যন্ত নাম পায়। আর দাড়ি টুপি পরা কয়েকজন হেটে গেলেও আমরা তার মধ্যে জঙ্গি মিছিলের গন্ধ খুজে পাই। কেন? কারণ ঐ আস্তে আস্তে আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে বিষয় গুলি।

ঠিক সেই ভাবে, এখন আরবীতে লেখাটাও পরে খুব খারাপ ফল বয়ে আনবে। আমি-আপনি আরবী পড়তে পারি না; কিন্তু শ্রদ্ধা করি। তাই ওখানে প্রসাব করবো না। কিন্তু বাসায় ফিরে যখনই ভিডিও দেখবো যে ওখানে কি লেখা ছিলো; আমাদের কিন্তু বুঝে আসবে যে ঐটা কিছুই না; এবং ওখানে প্রসাব করলে ইসলাম বা ধর্মের কিছু হবে না (যদিও ইসলামে খোলা স্থানে, মানুষের চলাচলের জায়গায় প্রসাব করবার উপরে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আছে)। এতে করে এক সময় যা যা তাই তাই হয়ে যাবে। আমরাও ওখানেই আরবী লেখার সামনে প্রসাব করবো। কারণ আমরা জানি ওখানে কিছু নাই। এরপর? এরপর একসময় দেখা গেলো যে কেউ একজন হয়ত কোরআনের একটা আয়াতই লিখে রেখেছে; আমরাতো বুঝবো না; আমরা ঠিকই প্রসাব করবো; কারণও ঐ একটাই, আমরা জানি যে ওখানে কিছু নাই।

এছাড়া এই কাজটি করে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায় দেওয়া হয়েছে যে আমাদের দেশের মানুষ আসলে ধর্মের দোহাইতে যে কোন কিছু বিশ্বাস করে। যা না হয়েছে কোন দিক দিয়ে ভালো, না ভবিষ্যতে ভালো ফল বয়ে আনবে। একটা মানুষের কোন বিষয়ের অজ্ঞতা নিয়ে তাকে সেই বিষয় দিয়ে ঠকানো, সে হোক ভালো কাজের জন্য, আর হোক খারাপ কাজের জন্য, কখনই ঠিক না। কারণ প্রতারণা সব সময়ই প্রতারণা।

আপনি যদি এই কথাটা মেনে নিতে না চান যে “প্রতারণা সব সময়ই প্রতারণা”, আপনাকে আর একটা উদাহরণ দেই। ধরেন আপনার ঢাকা শহরে মোট ১০০টা বাড়ি আছে। সব গুলির থেকেই আপনি বাড়িভাড়া হিসাবে যথেষ্ট পাচ্ছে। এখন কেউ একজন আপনার সাথে প্রতারণা করে একটা বাড়ি নিয়ে নিলো এবং সেটায় বিশাল এক এতিমখানা বানায় ফেলল; যাতে অন্তত ১০০জন এতিম বাচ্চা খুব ভালো ভাবে থাকতে পারবে। পারবেন আপনি মেনে নিতে?

আবার প্রথম উদাহরণে যাই; কামাল মিয়ার সঙ্গে প্রতারণা ঠেকাতে সরকার উদ্যোগ নিতে পারে কিন্তু আমাদের সাধারণ জনগনের সাথে সরকারই যদি একই ভাবে প্রতারণা করে, সেটা কিভাবে মেনে নেওয়া যায়?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *