যুগ-যুগান্তরের ভারতীয় সিরিয়াল

যুগ-যুগান্তরের ভারতীয় সিরিয়াল যেন এর কোন শেষ নাই! দেশে এখন যে কটা টপিক হট, তার মধ্যে ভারতীয় বাংলা ও হিন্দি সিরিয়াল অন্যতম। সম্প্রতি পাখি ড্রেসের জন্য আত্মহত্যা এবং তালাকের মত ঘটনা ঘটবার পরে এটা হট টপিক হতে বাধ্য। যদিও বাংলাদেশে চাপা ভাবে সব সময়ই ছেলেরা এর বিশাল বিরোধীতা করে আসে, আর আপুরা মোটামুটি চুপ চাপই থাকে। যদিও দুই গ্রুপের মধ্যেই ব্যাতিক্রম লোক আছে, এক্সেপশন ইজ নট এন এক্সামপল, থিউরি হিসাব করে তাদের বাদ দিলাম। তবে ক্যাচালে যাবো না, আমার একটা ছোট্ট ঘটনা আজকে শেয়ার করবো। মজা পাইলে পাইলেন, না পাইলে কিচ্ছু করবার নাই!

ঘটনা ২০১৩ এর। এর আগে থেকেই অবশ্য আমি এইগুলার উপরে চরম বিরক্ত। এইগুলা কোন গুলা? এই ভারতীয় হিন্দি আর বাংলা সিরিয়ালের কথাইতো বলছি। বিরক্তি যখন চরম সীমা অতিক্রম করতেছে, তখনই আমার ঢাকার বাসায় একজন কাজের বুয়ার হাজির; তাকে ভাবী বলেই ডাকতাম। তিনি দুনিয়ার সকল বিনোদনের থেকে বঞ্চিত হতে রাজী আছেন, এমনকি মাসের বেতনটাও ৫ দিন পরে নিতে রাজি আছেন, কিন্তু কোন ভাবেই তিনি এক পর্ব সিরিয়াল মিস করতে রাজি নাই। বাউ রে বাউ, সে কি অবস্থা, প্রতিদিন সন্ধা ৭-৭:৩০টায় বসে, আর রাত ১১:৩০ পর্যন্ত টিভি তার দখলে। কিসের ক্রিকেট, কিসের ফুটবল, সব জাহান্নামে যাক, সিরিয়াল তার চলবেই।

বাসার আর এক বড় ভাই সন্ধার পর বাসাতেই থাকতেন, উনিও দেখি কয়েক দিনের মধ্যে ভাবীর সাথে সিরিয়াল দেখা শুরু করলেন, পার্থক্য শুধু উনি দেখতেন আর ভাবীরে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে ক্ষ্যাপাতেন, আর ভাবী গম্ভীর ভাবে দেখতো।

যাই হোক, দেখতে দেখতে রোজার মাস চলে আসলো। আমি সাধারণত খাবার সব সময় নিজের রুমে এনেই খাই; কিন্তু সাহরী সবাই এক সাথে বসে খেতাম। রোজার মাস উপলক্ষে ভাবী তারাবীর নামাজের সময় যেই টুকু সিরিয়াল মিস করতেন, সেটা আবার দৈব্যক্রমে সাহরীর সময়ই দেখাতো। লে হালুয়া, ডিনার এন্ড শো! মানে ভাবী ঐসময় সাহরী খাইতেন, আর দেখতেন। প্রথম দিন দেখলাম কোন একটা বিয়ে বাড়িতে একটা গাড়ি এসেছে, সেখান থেকে কয়েক জন নামবে এবং ঐ বিয়ে বাড়িতে ঢুকবে। দিন যায়,সপ্তাহ যায়, প্রায় ২ সপ্তাহ পরে দেখি তারা গাড়ি থেকে নেমে রওনা দিছে। এ কি রে বাবা, তোদের দিন কত মিনিটে? কত ঘন্টায়?

যাই হোক, ২২ কি ২৪ রমজানের রাত্রে ভাবীকে জিজ্ঞাসা করলাম যে, কি অবস্থা? তিনি হাসি মুখে উত্তর দিলেন যে আজকে তারা বাড়িতে ঢুকবে। বুঝেন ঠ্যালা! বাড়ির সামনে গাড়ি দাড় করায় বাড়িতে ঢুকতে তাদের ২২ – ২৪ দিন লাগে, তাদের অবস্থা কি হবে? হাসতে হাসতে ভাবীরে বললাম, কপাল ভালো ওরা রোজা রাখে না। রোজা রাখলেতো প্রথম দিনের সাহরী করতে করতে রোজা শেষ হয়ে ঈদ চলে আসতো!

কোরবানীর ঈদের পর ভাবী চলে গেলেন, আর ঐ ভাইও আবার ডিসকভারী বা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে মন দিলেন। প্রায় একটা বছর কেটে গেছে মধ্যে। ঐ সিরিয়ালের কোন খোঁজ পাই নাই। এইবার রোজায় ঐ বড় ভাইয়ের মা আমাদের সাথে বেশ কদিন ছিলেন। একদিন সাহরীতে দেখি তিনিও সিরিয়াল দেখছেন; কিছু চরিত্র পরিচিত মনে হলো, কিছু অপরিচিত। মামী (বড় ভাইয়ের আম্মা) কে জিজ্ঞাসা করতেই বের হলো কাহীনি! উনি বললন গত বছর রোজার সময়ও উনারা ২টা সিরিয়াল দেখতেন, এটা তার একটা। আর ঐ বিয়ের সিরিয়ালটা এর পরেই।

মানে আগে পরে বাদ দিলেও গত এক বছর ধরে ঐ দুইটা সিরিয়াল চলে আসছে! আমার দশা তখন প্রায়, মাইরালা আম্রে কেউ মাইরালা! মানুষের ধৈর্য্য ক্যামনে এত শক্ত হয়? কোন এক ঈদে বাংলাদেশী এক নাটকে ৬ পর্বের ধারাবাহিক দিছিলো দেখে বাংলাদেশী ঐ নির্মাতারা গাধা বলছিলাম। আর এখন দেখি এরা তার থেকে বড় গাধা! আবার মাঝে মধ্যে মনে হয়, ওরা গাধা? নাকি আমাদের দেশী নির্মাতারা গাধা? নাকি যারা দেখে তারাই গাধা?

শেষ কথা

মাঝে দেশে একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম এমন ভারতীয় সিরিয়াল স্টাইলে করা হয়েছে, একটু ঘাটতেই পেলাম যে বাংলাদেশেও এখন এমন ক্যাচাইল্লা মেগা সিরিয়াল তৈরী হইতেছে! মুভি রেগুলার দেখি; বাংলাদেশী নাটকও কম দেখা হয় না। বাংলাদেশী এক পর্বের নাটক গুলির বেশীর ভাগ গুলিই এমন ভাবে হৃদয় ছুয়ে যায় যা বলবার মত না। কোন কোন নাটক আবার সারাজীবন মনে রাখবার মত। সেখানে কি করে কুটনামী, কুটচাল, শয়তানী, পরনিন্দা এগুলি দিয়ে তৈরী জিনিষই মানুষ দেখে?

দোষ কাদের? যারা বানাচ্ছে তাদের? নাকি যারা দেখছে তাদের? কোকাকোলার মত ড্রিংকস তৈরী করে প্রচুর কম্পানী, অনেকে শুরু করে আবার হারিয়ে যায়, কারণ কি? কারণ একটাই, তাদের চাহিদা নেই। যে জিনিষের চাহিদা নেই, সেই জিনিষের সাপ্লাই থাকবে না, থিউরি তাই বলে। এমন নাটক গুলি রেগুলার তৈরী হচ্ছে, এবং চলছে এর অর্থই প্রমান করে যে মানুষের চাহিদা আছে।

এবার একটু খারাপ কয়েকটা কথা বলি। তার আগে প্রশ্ন, সবাই কি রোমান্টিক মুভি পছন্দ করে? সবাই কি থ্রিলার মুভি পছন্দ করে? সবাই কি একশন মুভি পছন্দ করে? করে না! যার যেমনটা মনের মধ্যে, যে নিজেকে যেমন ভাবে পেতে চায়, তেমন মুভিই সে পছন্দ করে। যার গাড়ি এবং গাড়ির রেসিং খুব পছন্দ, সে ফাষ্ট এন্ড ফিউরিয়াস পছন্দ করে। এটাই নিয়ম। সেই হিসাবে বলা যায় আমরা বর্তমান সময়ে কুটনামি, কুটচাল, শয়তানী, পরনিন্দা এগুলিই পছন্দ করছি, তাই এগুলি নিয়ে নির্মিত নাটকই দেখছি।

অন্যের ঘরের দোষ ধরবার আগে নিজের ঘরের দোষ কেন ধরি না? আমরা মানুষ হিসাবে কোথায় যাচ্ছি? আমরা কি আসলেই মানুষের পিছনে লেগে থাকতে পছন্দ করি? মানুষের ক্ষতিতেই কি আমাদের শান্তি মিলে? মানুষের ক্ষতি করে কখনও নিজে শান্তিতে থাকা যায় বলে আমি মনে করি না, সম্ভব না। আপাত দৃষ্টিতে শান্তি এলেও সেটা শান্তি না।

বিঃদ্রঃ লেখাটা মজা করবার জন্যই লেখা শুরু করেছিলাম, কিন্তু শেষ হলো কতগুলি প্রশ্ন দিয়ে। এ জন্য আমার পাঠকের কাছে আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।

4 thoughts on “যুগ-যুগান্তরের ভারতীয় সিরিয়াল

  1. শফিউল ভাই, এখন ত মার্কেট এ সব হিন্দি কাপড়, সব কিছু এদের কারনে। ভাল লিখেছেন !!!

Leave a Reply