মাথা ব্যাথা তো নিজের মাথা কাটেন, মাথায় বাড়ি দেন ক্যা?

মাথা ব্যাথা তো নিজের মাথা কাটেন, মাথায় বাড়ি দেন ক্যা? এমন টাইটেল দেখে হঠাৎ ঘাবড়ে যাবেন না। এবং মনে করবেন না যে এটা কি শুনলাম। আমি খুব হিসাব করেই কথাটা লিখেছি। আপনি হয়ত ভাবছেন যে মাথা ব্যাথা হইছে তাই বলে মাথা কাটতে হবে কথা শুনেছেন, কিন্তু মাথায় বাড়ি দেবার কথা কেন লিখেছে?  কথাটা লিখেছি সম্প্রতি আমাদের শিক্ষামন্ত্রীর নেওয়া এক সিদ্ধান্ত থেকে।

আমার ধারণা আপনি ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন যে সম্প্রতি সময়ে বাংলাদেশে পাবলিক পরীক্ষা গুলিতে প্রচুর পরিমানে প্রশ্ন আউট হবার ঘটনা ঘটছে। আর এটা নিয়ে আমাদের শিক্ষামন্ত্রী প্রথম দিকে খুব একটা বিচলিত ছিলেন না, এবং এখনও যে খুব একটা বিচলিত তা মনে হয় না। এমনকি তিনি খুবই ভদ্র ভাষা এগুলিকে বানোয়াট বা মিথ্যা খবর বলতেও দ্বিধা করেন নি।

তারই গঠিত তদন্ত কমিটি অবশেষে জানিয়েছে যে হুমম, প্রশ্নতো বাবা আউট হইছেই। তো উনি দ্রুত এর সমাধানে যেটা করলেন, সেটা এমন যে মাথা ব্যাথা কমাতে মাথাতেই বাড়ি দেওয়া হলো, মাথা কাটলেও একটা কথা ছিলো; মানতে পারতাম।

উনি সিদ্ধান্ত নিছেন যে এখন থেকে পাবলিক পরীক্ষা গুলির মধ্যে খানে কোন ছুটিই থাকবে না। লে বাবা, এবার প্রশ্ন আউট করে দেখা! আমি জানি না যে উনি ভুল বুঝছেন নাকি আমি! কারণ আমার ধারণা যে একটা পরীক্ষার পর অন্য পরীক্ষার জন্য সময় না পেয়ে ছাত্র-ছাত্রীরা প্রশ্ন পাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে, কারণ তাদের প্রিপারেশন ভালো থাকবে না, আর যারা ইকোনোমিকস (অর্থনীতি) এর দু এক পেইজ পড়েছেন তারা এটাও জানেন যে বাজারে চাহিদা থাকলে সে পন্যের দাম বাড়বে এবং সাপ্লাইও বাড়ার কাজ চলবে। তো এই পর পর পরীক্ষা নিয়ে কি হবে? শুধুই প্রশ্ন আউটের জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের আগ্রহ বাড়বে, এবং যারা প্রশ্ন আউট করছে তারা কয়েকগুন বেশী উৎসাহে প্রশ্ন আউটে ঝাপিয়ে পড়বে।

এবার নিশ্চই বুঝেছেন যে টাইটেলে মাথা না কেটে মাথায় বাড়ি দিয়েছে কেন বলছি। মাথা ব্যাথা থাকা অবস্থায় মাথায় বাড়ি দিলেতো মাথাব্যাথা আরও বেড়ে যাবে, এবং এক্ষেত্রেও সেই একই কাজ করা হয়েছে।

আমার বয়স খুব বেশী না, তাই আমি সঠিক জানি না; তবে বুঝতে শেখার পর থেকে এই পর্যন্ত এত এত প্রশ্ন আউটের ঘটনার কথা আগে কখনও শুনেছি বা পড়েছি বলে মনে নাই। গুরুজনেরা ভালো বলতে পারবেন। আব্বা আম্মার কাছে শুনেছি যে ১৯৭১ এ পাকিস্তান সরকার গড়ে সবাইকে পাশ কারায় দেশ ঠান্ডা রাখার ব্যবস্থা করেছিলো, কিন্তু তখনও প্রশ্ন আউট হয়েছে এমনটা মনে হয় হয়নি। ১৯৭২এও দেশের অবস্থা খারাপ ছিলো, তখনের যা কথা শুনি, তাতেও এমন শুনিনি।

আমার পরিবারের কাজের সাহায্যার্থে আমি ক্লাস ফাইভে থাকা অবস্থা থেকেই আব্বার সাথে দোকানে বসতাম, দোকান বলতে বইয়ের দোকান। আমাদের দোকান ছিলো স্কুলের পাশেই। তাই এসএসসি পরীক্ষার সময় মানুষের হুড়াতাড়া দেখতে পেতাম। ১৯৯৭-১৯৯৯ এ তিন বছর এসএসসি পরীক্ষার সময় নকলের যে ছড়াছড়ি দেখেছি, তাতে ২০০১ এ এসএসসি পরীক্ষা দিতে বসে নিজেরই আফসোস লাগতো যে দুনিয়ায় আর ২/৩টা বছর আগে ক্যান পয়দা হইলাম না। পরীক্ষা শুরু হবার মাত্র ১০-২০ মিনিটের মধ্যেই প্রশ্ন কেউ না কেউ বাইরে ফেলে দিতো, আর লোকজন বই নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করে সেই উত্তর লিখে পরীক্ষার হলে সাপ্লাই দেওয়া হতো। পুরো কাজটাই হতো পুলিশের সামনেই। এর জন্য পুলিশও টাকা নিতো।  আমার আব্বা এদের সাহায্য করতে চাইতেন না দেখে আমরা ঐ সময়টাতে দোকান বন্ধ রাখতাম; না হলে এরা কাগজ আর কলম কিনতে দৌড়াতো ঐ সময়ে। যদিও আমাদের দেখার বিষয় না, তবে আব্বা চাইতেন না যে তার কাছ থেকে কেনা কাগজ কলম দিয়ে খারাপ কাজে ব্যবহার করা হোক।

আমি এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছি ২০০৪ সালে; তখন একজন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর নাম খুব শোনা যেতো, তিনি নাকি হেলিকপ্টর করে করে বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে নকল ধরে বেড়াতেন। আপনি যেই দলের সাপোর্টারই হোন না কেন, আপনাকে মানতেই হবে যে ১৯৯৭-১৯৯৯ এর ঐ নকলের স্রোত ততদিনে ঐ শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বেশ ভালো ভাবেই টেনে ধরেছেন। কিছু নকল হতো না এমন না; কিন্তু সেটা গতানুগতিকের থেকেও প্রচন্ড মাত্রায় কম। তবে অবাক হয়েছিলাম তৎকালীন বিরোধী দল যখন তার হেলিকপ্টরে করে এখানে ওখানে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করেছে, কিন্তু কাজের বিষয়ে এতটুকু বাহবা দেয় নি।

এই লেখাটা লিখতে বসে তার নাম নে করতে পারছিলাম না, গুগলে সার্চ করবার চেষ্টা করতেই প্রথমেই একটা নিউজের লিংক পেলাম; সেখানে ঢুকে দেখি তাকে চেইন, মোবাইল এইগুলার ছিনতাই মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে হয়। এবং এই ছিনতাই নাকি তিনি প্রতিমন্ত্রী থাকা অবস্থায় করেছেন। যাষ্ট একটা দৃশ্য চিন্তা করেন, দেশের কোন একটা মন্ত্রাণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাস্তায় দাড়ায় মোবাইল ছিনতাই করছেন। নিশ্চই আপনার ঐ দৃশ্য চিন্তা করতে কষ্ট হবে। কারণ প্রতিমন্ত্রী তার কলমের খোচাঁয় একবারেই যখন হাজারটা মোবাইলের টাকা কামাইতে পারেন, রাস্তায় খাড়ায় তার ক্যান মোবাইল ছিনতাই করতে হবে? তখনই বুঝে নেওয়া যায় যে বর্তমান সরকার লেখাপড়ায় নকল, প্রশ্ন আউটের বিষয়ে ঠিক কতটা সচেতন, তারা আসলেই চায় এমনটা হোক।

অনেক পক পক করেছি, এবার সরাসরি কিছু কথা বলবার চেষ্টা করি। প্রথমত পরপর পরীক্ষা নিলে প্রশ্ন আউট কমবে না এটা জানা কথা; এর জন্য ধরতে হবে দ্বায়ী বেক্তিদের, সিষ্টেমটাকে কঠোর করবার। কিন্তু তা না করে উল্টা কাজ করা মানেই ব্যাথা মাথায় বাড়ি দিয়ে আরও ব্যাথা বাড়িয়ে দেওয়া। পত্রিকার বদৌলতে আমরা পাবলিক পরীক্ষাগুলির প্রায়গুলার সময়ই এখন দেতে পাই কি পরিমান প্রশ্ন আউট হচ্ছে। প্রশ্ন আউট যে হচ্ছে এটা প্রমানের কোন দরকার আর নাই। কিন্তু সরকারকে প্রমান করতে হবে তারা এটা ঠেকাতে চায়। সেটা না করে এমন হঠোকারী সিদ্ধান্ত নেওয়ার অর্থ একটাই, সরকারই চায় এমন কিছু অবস্থা তৈরী করতে, যাতে প্রশ্ন আউট বাড়ে।

আশাকরি সরকার এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে, এবং মূল প্রশ্ন আউটকারীকে ধরে এমন সাজা দিবে যা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আমার মনে হয় এ সরকার এ কাজটা সহজেই করতে পারে; যদি তারা চায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *